সেমিফাইনাল আর ফাইনাল ট্র্যাজেডির দল বলা হয় জার্মানিকে! ফুটবলের যেকোনো আসরে সব সময়ই ফেভারিটের তকমা থাকে তাদের গায়ে। ফাইনাল আর সেমিফাইনালে হারের লম্বা মিছিলে যোগ না দিলে জার্মানদের বিশ্ব ফুটবলের সেরা দল আপনাকে বলতেই হতো! সেক্ষেত্রে ব্রাজিলের আগে তাদের নামটিই উচ্চারণ করতে হতো।
তবে এবার ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ জিতে সবার সেরা হওয়ার সুযোগ আছে জার্মানদের। এ লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় ইউরোপের পাওয়ার হাউসরা লড়বে বলে জানিয়েছেন দলটির কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান। কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারও বিশ্বকাপে ‘ই’ গ্রুপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ কুরাসাও, আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডর। যুক্তরাষ্ট্রের হিউসটনের এনআরজি স্টেডিয়ামে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ছোট্ট দেশ কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধারের মিশন শুরু করছে অধিনায়ক জসুয়া কিমিচের দল। ম্যাচটি শুরু হবে আজ রাত ১১টায়।
যখন চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি মাঠে নামবে, তখন তাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকবে ফুটবল বিশ্বের এক নতুন বিস্ময়। একদিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা জার্মানদের গৌরবগাঁথা, অন্যদিকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের মাত্র কয়েক লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওয়ের স্বপ্নযাত্রা। অসম এই লড়াই দেখতে মুখিয়ে আছে ফুটবল দুনিয়া। এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি দুই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। এক পাশে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি, অন্য পাশে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো পা রাখা কুরাসাও। জার্মানি ও কুরাসাও এর আগে কখনো আন্তর্জাতিক ফুটবলে একে অপরের মুখোমুখি হয়নি। ফলে বিশ্বকাপের ম্যাচটিই হবে দুই দলের ইতিহাসের প্রথম সাক্ষাৎ।
বিগত কয়েক বছরের ব্যর্থতা ঘুচিয়ে আবারও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হওয়ার পথে আছে জার্মানি। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর দলটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গেছে। এখন কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সংমিশ্রণে একটি আক্রমণাত্মক এবং দ্রুতগতির দল গড়েছেন। দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ মিডফিল্ড ও আক্রমণভাগ। বিশেষ করে জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান উইর্টজ, জসুয়া কিমিচ, কাই হার্ভাটেজ এই মুহূর্তে জার্মানির আশা-ভরসার প্রতীক। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মুসিয়ালা ও উইর্টজের জুটি বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড জুটি।
জার্মানি ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও দারুণ খেলেছে। তারা নিজেদের গ্রুপে শীর্ষে থেকে সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি ম্যাচ জিতেছে বিশাল ব্যবধানে। বিশেষ করে স্লোভাকিয়াকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা তাদের শক্তির জানান দিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে জার্মানির প্রথম লক্ষ্য অন্ততপক্ষে সেমিফাইনাল খেলা নিশ্চিত করা। সেটি করতে পারলে তারা সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে স্পর্শ করতে চাইবে। ২০১৪ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জয় করা জার্মানি এবার সফল হলে রেকর্ড ও পরিসংখ্যানে পেলের দেশের অর্জনকে ছাপিয়ে যাবে। বিশ্ব ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকেই জার্মানিকে এবার সম্ভাব্য শিরোপা দাবিদারদের মধ্যে রাখছেন। কারণ, দলটির স্কোয়াডে এখন গতি, টেকনিক, তরুণ শক্তি এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বসহ সবকিছুর ভারসাম্য রয়েছে। অবশ্য তবে তাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। রক্ষণভাগে ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকারের অভাব এবং বড় ম্যাচের চাপ সামলানো এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরপরও বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় জার্মানি এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামার অপেক্ষায়।
২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ জিতে সাফল্যের বৃত্ত পূরণ করে জার্মানি। কেননা এর আগে বৈশ্বিক সব টুর্নামেন্টের ট্রফি জিতলেও কনফেডারেশন্স কাপই শুধু বাকি ছিল। বর্তমানে জার্মানদের শোকেসে চারটি বিশ্বকাপ (১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪), তিনটি ইউরো ও একটি কনফেডারেশন্স কাপের ট্রফি শোভা পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে চারবার রানার্সআপ (১৯৬৬, ১৯৮২, ১৯৮৬, ২০০২) ও তিনবার তৃতীয় হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোর ইতিহাসে জার্মানিই এককভাবে সর্বোচ্চ তিনবার শিরোপা জয় করেছে (১৯৭২, ১৯৮০, ১৯৯৬)। ইউরোতে সর্বোচ্চ তিনবার রানার্সআপ হওয়ার রেকর্ডও জার্মানদের (১৯৭৬, ১৯৯২, ২০০৮)। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে (১৯৯৬ ইউরো) পাওয়া সাফল্যের পর দীর্ঘ ১৮ বছর বড় কোনো আসরের শিরোপা জয় করতে ব্যর্থ হয় অদম্য জার্মানরা। এ সময় কি ইউরো, কি বিশ্বকাপ প্রতিটি আসরেই তীরে এসে তরি ডুবে তাদের। ২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হার, ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে তৃতীয়। অন্যদিকে ২০০৮ ইউরোর ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হতে হয়। জার্মানরা ধারাবাহিক এই কষ্টের বোঝার অবসান ঘটায় ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে।
বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ দেড় যুগ পর বড় আসরের ট্রফি জয়ের উৎসব করে তারা। আর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় দীর্ঘ দুই যুগ অর্থাৎ ২৪ বছর পর। সাফল্যের এ ধারা এর পরও ধরে রাখতে সক্ষম হয় যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এরপর দেশটির যুবারা জিতেছে অনূর্ধ্ব-২১ বিশ্বকাপের শিরোপাও। কিন্তু সবশেষ দুই বিশ্বকাপে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে অদম্য জার্মানি। দুটি আসরেই বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে। এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপে সেই ব্যর্থতা ভুলে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে চায় জার্মানরা।
কাগজে-কলমে শক্তির ব্যবধান বিশাল হলেও ম্যাচটিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না পরাশক্তি জার্মানি। জার্মানরা চাইছে শিরোপা মিশনের আত্মবিশ্বাসী সূচনা, আর কুরাসাও চাইছে ইতিহাস গড়ার এক অবিস্মরণীয় রাত। জার্মানির প্রধান কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ছোট দল বলে কাউকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বিশ্বকাপে নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতা। কুরাসাও আমাদের জন্য নতুন প্রতিপক্ষ। তাই তাদের বিপক্ষে পুরো মনোযোগ নিয়েই নামতে হবে। নাগেলসমান আরও জানান, দলটি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চায় এবং প্রথম ম্যাচ থেকেই ছন্দে ফিরতে মরিয়া। জার্মান অধিনায়ক জসুয়া কিমিচও সতীর্থদের সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন। তার ভাষায়, বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ সহজ নয়। আমরা জানি সমর্থকরা বড় ব্যবধানে জয় আশা করছে, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য প্রথমে ভালো ফুটবল খেলা এবং তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে কুরাসাও কোচ ডিক অ্যাডভোকেট ম্যাচটিকে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, জার্মানির মতো দলের বিপক্ষে খেলা আমাদের জন্য সম্মানের। কিন্তু আমরা শুধু অংশ নিতে আসিনি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে এসেছি। অভিজ্ঞ এই কোচ মনে করেন, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণই হতে পারে কুরাসাওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কুরাসাও অধিনায়ক কুকো মার্টিনা জানিয়েছেন, দলের খেলোয়াড়রা ভয় নয়, বরং রোমাঞ্চ নিয়ে মাঠে নামবে। তিনি বলেন, আমরা জানি জার্মানি কত বড় শক্তি। কিন্তু বিশ্বকাপ এমন জায়গা, যেখানে এক রাতেই গল্প বদলে যেতে পারে। আমরা নিজেদের সেরাটা দিতে চাই।