সেই ১৯৩৪ দ্বিতীয় আসর থেকে নেদারল্যান্ডসের এটি ১২তম বিশ্বকাপ। তিনবারের রানার্সআপ ডাচরা ফাইনাল খেলেছে ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ বিশ্বকাপে। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে বর্তমান অবস্থান ৮ নম্বরে। রীতিমতো শিরোপার স্বপ্ন-চোখে মার্কিন মুলুকে পা-রেখেছে রোনাল্ড কোম্যানের দল। অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালে প্রথমবার শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে নাম লেখানো জাপানের এটি টানা অষ্টম আসর। গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে পেরেছে ৪ বার। সর্বশেষ ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান ১৮তম। পরিসংখ্যান বলছে, নেদারল্যান্ডস হট-ফেবারিট। কিন্তু যখন জানবেন ৪৮ দলের বিশ্বকাপে এবার তিন আয়োজকের বাইরে সবার আগে কোয়ালিফাই করেছে যে দেশ সেটি জাপান, তাও তিন ম্যাচ হাতে রেখে। বাছাইয়ে হাসিমে মোরিয়াসুর দল ১০ ম্যাচে করেছে ৩০টি গোল, খেয়েছে মাত্র ৩টি, হেরেছে মাত্র একটি, তখন যে কেউ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য।
নেদারল্যান্ডস বস রোনাল্ড কোম্যান তো স্পষ্টই বলেছেন, ‘ডাচরা অবশ্যই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু তার আগে আমাদের গ্রুপ-পর্বের দিকে তাকাতে হবে, তারও আগে প্রথম ম্যাচের দিকে!’ ডালাসের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে আগাম উত্তাপ ছড়ানো ম্যাচটি শুরু আজ বাংলাদেশ সময় রাত ২টায়। এফ-গ্রুপের অপর দুই দল সুইডেন ও তিউনিসিয়া।
জাপানের দুঃসংবাদ ইনজুরির কারণে শেষ মুহূর্তে ছিটকে গেছেন অধিনায়ক ও অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ওয়াতারু এন্দো। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলকেও বিদায় জানিয়েছেন এই তারকা। তবে সুসংগঠিত ব্লু সামুরাইদের স্কোয়াডের গভীরতা ও ব্যাকআপের কমতি নেই। তার পরিবর্তে দলে জায়গা পেয়েছেন শুতো মাচিনো, যিনি জার্মান ক্লাব বরুসিয়া মনসেনগ্ল্যাডবাকের হয়ে খেলেন। গত মার্চে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়েছে জাপান। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইংলিশদের বিপক্ষে জয় পেয়েছে তারা। মোরিয়াসু ২০১৮ সাল থেকে দলের সঙ্গে আছেন। ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কোচ হওয়ার সুবাদে বর্তমান প্রজন্মের প্রায় সব খেলোয়াড়কে অনেক দিন ধরে চেনেন। জাপান মাস্টার মাইন্ড দ্রুতগতির ফুটবল পছন্দ করেন। তার অধীনে দেশটি মূলত ৩-৪-৩ ফরমেশনে খেলে এবং প্রতিপক্ষকে নিরবচ্ছিন্ন চাপে রাখে।
জাপানের কাউন্টার-অ্যাটাক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক। পোস্টের নিচে জাপানের প্রধান ভরসা এখন পার্মার তরুণ গোলকিপার জায়ন সুজুকি। ২০২২ সালে কেইসুকে হোন্ডার অবসরের পর থেকে তিনি নিয়মিত খেলছেন। ব্যাকআপ হিসেবে কেইসুকে ওসাকো এবং তোমোকি হায়াকাওয়া দলে রয়েছেন। জাপানের রক্ষণের অন্যতম চাবিকাঠি হিরোকি ইতো। বায়ার্ন মিউনিখে খেলা এই তরুণ সেন্টার-ব্যাক ও লেফট-ব্যাক উভয় পজিশনেই দক্ষ। তাকেফুসা কুবো, জুনোসুকে সুজুকি ও শোগো তানিগুচির মতো অভিজ্ঞরা রয়েছেন। ক্রিস্টাল প্যালেসে খেলা দাইচি কামাদা আক্রমণে বড় ভূমিকা রাখবেন। এ ছাড়া কাইসু সানো এবং আও তানাকা মতো প্রতিভারা মাঝমাঠে বিকল্প হিসেবে তৈরি আছেন। ১৯৯৮ থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই খেলেছে জাপান।
টোটাল ফুটবলের ধারক নেদারল্যান্ডস বরাবরই ফুটবল বিশ্বের এক মহাশক্তি। যদিও ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি, বাছাই পর্বে ফ্রান্স ও সুইডেনের পেছনে থেকে তারা গ্রুপে তৃতীয় হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ডাচদের ভাগ্য নির্ধারণ হয় সেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে ৩-৪ গোলে হেরে। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচটি নির্ধারিত সময়ে খেলা ২-২ সমতায় শেষ হয়েছিল। বিশ্বকাপে ডাচদের ডাগআউটের রোনাল্ড কোম্যান ২০২৩ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন। পোস্টের নিচে নেদারল্যান্ডসের বেশ কিছু ভালো বিকল্প রয়েছে। ব্রাইটনের বার্থ ভারব্রুগেন বর্তমানে প্রধান গোলকিপার হওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন। বায়ার লিভারকুসেনের মার্ক ফ্লেকেন এবং সান্ডারল্যান্ডের রবিন রোয়েফস বিকল্প হিসেবে কোচ কোম্যানের তালিকায় থাকতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা রক্ষণভাগ ডাচদের। অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক দলটিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ ছাড়া নাথান আকে, স্টেফান ডি ভ্রি এবং ইয়ান পল ফন হেকে রক্ষণের গভীরতা বাড়িয়েছেন। দুই উইংয়ে ডেনজেল ডামফ্রিস এবং জেরেমি ফ্রিমপংয়ের মতো আক্রমণাত্মক ডিফেন্ডাররা কোম্যানের প্রধান অস্ত্র।
মাঝমাঠে ডাচদের গভীরতা রক্ষণভাগের চেয়ে কিছুটা কম হলেও মানের দিক থেকে তারা অনন্য। বার্সেলোনার ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং বর্তমানে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। তিনিই দলের মূল চালিকাশক্তি। গত বছর ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়া তিজানি রেইন্ডার্স এবং লিভারপুলের রায়ান গ্রাভেনবার্চ মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। এ ছাড়া ম্যাটস উইফার এবং কুইন্টেন টিম্বারের মতো দক্ষরা রয়েছেন দলে। ডাচদের আক্রমণভাগও বেশ সমৃদ্ধ। নেদারল্যান্ডসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১০৯ ম্যাচে ৫৫টি) মেমফিস ডিপাই গোল করার মূল দায়িত্ব পালন করবেন। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেবেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লিভারপুলে (১২৭ ম্যাচে ৩২ গোল) খেলা কোডি গাকপো। জাতীয় দলের জার্সিতে ৫০ ম্যাচে এই ফরোয়ার্ডের গোল ২১টি। এ ছাড়া ডনিয়েল মালেন, জশুয়া জিরকজি এবং ব্রায়ান ব্রবিরা দলের আক্রমণভাগকে আরও শক্তিশালী করেছেন। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি যেখানে টিকতে পারেনি সেখানে এবারের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে নেদারল্যান্ডস ছিল অপরাজিত। পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, মাল্টা ও লিথুয়ানিয়ার গ্রুপে শীর্ষে থেকে তারা সরাসরি মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। শেষ ম্যাচে লিথুয়ানিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে পোল্যান্ডকে পেছনে ফেলে ডাচরা। ইয়োহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবল দর্শনের ছায়া এখনো দলটির মধ্যে বিদ্যমান।
বিশ্বকাপ রেকর্ডস
নেদারল্যান্ডস
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৮
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: এ নিয়ে ১২ বার
সেরা ফল: ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ আসরে রানার্সআপ
শক্তি: বল দখলে দক্ষতা
দুর্বলতা: চাপের মুখে ভেঙে পড়া
জাপান
ফিফা র্যাঙ্কিং: ১৮
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: এ নিয়ে ৮ বার
সেরা ফল: ২০০২, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ আসরে শেষ ষোলো
শক্তি: দ্রুতগতির ফুটবল ও দলগত সমন্বয়
দুর্বলতা: শক্তিশালী দলের বিপক্ষে শারীরিক লড়াইয়ে পিছিয়ে