ছবি: সংগৃহীত
মহাকাশে সফলভাবে তিনটি ‘ব্লক ২ ব্লুবার্ড’ স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে এএসটি স্পেসমোবাইল। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের কেপ কানাভেরাল থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের সাহায্যে ৮, ৯ এবং ১০ নম্বর ব্লুবার্ড স্যাটেলাইট তিনটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ স্মার্টফোনে সরাসরি স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
এই ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে কোনো অতিরিক্ত সিম কার্ড, বিশেষ হ্যান্ডসেট ও বাড়ির ছাদে ডিশ অ্যান্টেনার প্রয়োজন হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের এটিঅ্যান্ডটি এবং ভেরাইজন গ্রাহকরা প্রথম এই আধুনিক সেবা পাবেন।
সাধারণ স্মার্টফোন সাধারণত শূন্য দশমিক ২ থেকে ২ ওয়াট শক্তিতে রেডিও সংকেত পাঠায়। এই সংকেত কেবলমাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের মোবাইল টাওয়ারে পৌঁছাতে সক্ষম। অন্যদিকে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার উঁচুতে ঘণ্টায় ১৭ হাজার মাইল বেগে ছুটে চলে। এই বিশাল দূরত্বের কারণে সাধারণ ফোন থেকে সংকেত আদান-প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন। প্রকৌশলীরা একে ‘লিংক বাজেট’ সমস্যা বলে থাকেন। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান স্যাটেলাইটের অ্যান্টেনা অনেক বড় করা।
নতুন প্রতিটি ব্লুবার্ড স্যাটেলাইটে প্রায় ২ হাজার ৪০০ বর্গফুটের অ্যান্টেনা রয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক যোগাযোগ অ্যান্টেনা। এটি এই প্রতিষ্ঠানের আগের ব্লক ১ স্যাটেলাইটের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বড়। বিশাল এই অ্যান্টেনার কারণে স্যাটেলাইটগুলো মোবাইল থেকে আসা অতিক্ষীণ সংকেতও সহজে শনাক্ত করতে পারবে। এর পর সেই সংকেত গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরের মূল নেটওয়ার্কে পাঠিয়ে দেবে।
এই স্যাটেলাইটগুলোর মূল চালিকাশক্তি তাদের নিজস্ব ‘এএসটি ৫০০০’ চিপ। এটি তৈরিতে বিজ্ঞানীদের ১৫০ বছর সমমানের সম্মিলিত গবেষণা করতে হয়েছে। প্রতিটি স্যাটেলাইট সেকেন্ডে প্রায় ২০০ মেগাবিট (এমবিপিএস) সর্বোচ্চ গতিতে ডেটা সরবরাহ করতে পারবে। এটি আগের সংস্করণের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতি। সাধারণ ৪জি ও ৫জি স্মার্টফোন কোনো ধরনের সফটওয়্যার বা ফার্মওয়্যার আপডেট ছাড়াই সরাসরি এই স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। মহাকাশে থাকা এই স্যাটেলাইটগুলো মূলত ভাসমান মোবাইল টাওয়ার হিসেবে কাজ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) এএসটি স্পেসমোবাইলকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২৪টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। বর্তমানে মহাকাশে তাদের মোট ১০টি কার্যকর স্যাটেলাইট রয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে তারা ৪৫টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বিশ্বের প্রায় ৬০টি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের সঙ্গে তাদের চূড়ান্ত বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ কোটি গ্রাহক এই প্রযুক্তির সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল, সমুদ্র এবং যেখানে প্রথাগত মোবাইল টাওয়ার নেই, সেখানে এই প্রযুক্তি জরুরি যোগাযোগ সচল রাখবে।
এই সফল উৎক্ষেপণটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে তারা পরপর দুটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। ১৯ এপ্রিল ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেটের কারিগরি ত্রুটির কারণে তাদের ব্লুবার্ড ৭ স্যাটেলাইটটি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে তাদের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়। এর পর মে মাসে এক পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে নিউ গ্লেন রকেটের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের ওপর এখন পুরো ভরসা করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
স্পেসএক্সের নিজস্ব স্টারলিংক প্রযুক্তির সঙ্গে এর বড় পার্থক্য রয়েছে। স্টারলিংক ছোট আকারের অনেক স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। তারা বর্তমানে শুধু টেক্সট আদান-প্রদানের সুবিধা দিচ্ছে। তবে এএসটি স্পেসমোবাইলের অ্যান্টেনা স্টারলিংকের চেয়ে ৩৫ থেকে ৪০ গুণ বড়। এ কারণে তারা সরাসরি সাধারণ ফোনে উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও ভয়েস কল দিতে পুরোপুরি সক্ষম। ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে এই বাণিজ্যিক সেবা পুরোদমে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব মানুষের কোনো নেটওয়ার্ক নেই, তাদের জন্য এই প্রযুক্তি যোগাযোগব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও নতুন বিপ্লব নিয়ে আসবে।