সম্প্রতি একটি বিশেষ কাজের সূত্রে সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়েছিলাম। এবারের ভ্রমণে সেখানে টানা ছয় দিন কাটানোর সুযোগ পেয়েছি। এই সময়ে দেখেছি সেন্টমার্টিনের অপরূপ সৌন্দর্য, স্থানীয় মানুষের কঠিন জীবন সংগ্রাম, বাইরে থেকে আগত ব্যবসায়ীদের নানা দাপট এবং কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানতে পারলাম, সেন্টমার্টিনে ভ্রমণ করতে গেলে ট্রাভেল পাস প্রয়োজন। তবে এটি শুধু জাহাজে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ জাহাজের টিকিট কেনার মাধ্যমে ট্রাভেল পাস পাওয়া যায়। কিন্তু এবারের যাত্রা আমি চেয়েছিলাম একটু রোমাঞ্চকর। তাই টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিস থেকে পারমিশন নিয়ে আমি পরিকল্পনা করলাম স্পিডবোটে যাত্রা করার। যদিও স্থানীয় মানুষজন ছাড়া স্পিডবোটে অন্য কেউ যেতে পারেন না। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড এই ব্যাপারে খুব কড়া নজর রাখে।
শাহপরীর দ্বীপ থেকে স্পিডবোটে চেপে রওনা দিলাম বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে। যাত্রার শুরুটা আনন্দঘন হলেও মাঝ সমুদ্রে কিছুটা ভয়ও অনুভূত হলো। বিশাল ঢেউয়ের মাঝে স্পিডবোটকে সামান্য এক টুকরো কাগজের নৌকা মনে হচ্ছিল। প্রায় ৪০ মিনিট পর সেন্টমার্টিনে পৌঁছালাম। দূর থেকে যখন দ্বীপকে দেখলাম, তখন তার অপরূপ সৌন্দর্য সত্যিই মন জয় করেছিল।
ছয় দিনের এই যাত্রায় পুরো দ্বীপকে তিন ভাগে ভাগ করে ঘুরে দেখার সুযোগ মিলেছে। বিচ ধরে হেঁটে প্রতিটি জায়গা থেকে দ্বীপকে দেখার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে। কোথাও দেখা মিলল জলরাশি সৈকত, কোথাও কোরাল বিচ, আবার কোথাও বালুকাময় সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্য। পর্যটক কম থাকায় অনেক জায়গা ছিল শান্ত ও জনশূন্য। চোখে পড়ল শুশুক এবং জীবন্ত কোরালও। যদিও ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল, তবুও দূর থেকে তার সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ মিলেছে। প্রতিটি মুহূর্তে প্রকৃতির নান্দনিকতা, সমুদ্রের নীরবতা এবং দ্বীপের শান্তি এক অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে স্মৃতিতে থেকে যাবে।
সেন্টমার্টিনের স্থানীয় মানুষরা একসময় প্রধানত কৃষিকাজ ও মৎস্য শিকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পর্যটনশিল্পের আগমনে অনেকেই এই প্রথাগত পেশা থেকে দূরে সরে গেছেন। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের কারণে স্থানীয়রা আবার তাদের প্রাচীন পেশায় ফিরতে শুরু করেছেন। তবে পর্যটন মৌসুমে সবাই কোনো না কোনোভাবে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান।
সেন্টমার্টিনের মানুষরা অত্যন্ত আন্তরিক এবং সাহায্যপ্রবণ। এবারের ভ্রমণে আমি কয়েকবার স্থানীয় খাবার খেয়েছি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কিছু সময় ধরে সাদা মাছি নামক রোগের কারণে দ্বীপে আগের মতো নারিকেল জন্মায় না। ফলে, পর্যটন মৌসুমে নারিকেলের দাম বেড়ে যায়। এ ছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা টেকনাফ থেকে ডাব নিয়ে এসে সেন্টমার্টিনের বলে চড়া দামে বিক্রি করেন।
স্থানীয়রা তাদের সবজি বাগান, মাছ ও অন্যান্য ফসল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পর্যটকদের আগমনে বাইরে থেকে অনেক ব্যবসায়ী এলেও স্থানীয়দের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন তেমন চোখে পড়ে না। সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা মাইকেল ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই পর্যটন ব্যবসা থেকে আয় নির্ভরতা কমিয়ে আবার মৎস্য শিকার ও চাষাবাদ শুরু করেছেন। মৎস্যজীবীরা মৌসুমে মাছের পূর্ণ মূল্য পান, অন্য সময়ে আয়ের উৎস কমে যায়। যারা কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, তারা প্রথমে পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বাকি ফসল বাজারে বিক্রি করেন।
এবারের যাত্রায় সেন্টমার্টিনে কচ্ছপের প্রজননের জন্য নির্ধারিত কয়েকটি এলাকা চোখে পড়েছে, যেখানে শান্ত ও নীরব পরিবেশ বিরাজ করছিল। বিভিন্ন জায়গায় প্লাস্টিকের বোতল কিংবা অন্যান্য আবর্জনা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট পয়েন্টে ডাস্টবিন বসানো ছিল, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য আবার সৈকতে জমে থাকতে দেখা গেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা থাকলে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে আমার মনে হয়।
এ ছাড়া এ বছর দ্বীপে শব্দদূষণ ছিল একটি বড় সমস্যা। দ্বীপে নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রায় সব জায়গায় জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। বিশেষ করে বাজার এলাকায় প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনেই জেনারেটরের শব্দ কানে এসেছে। এর পাশাপাশি কিছু ব্যবসায়ীকে খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা পোড়াতে দেখা গেছে, যা বায়ুদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণেই তাদের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সচেতনতা গড়ে ওঠেনি।
সেন্টমার্টিন, যদিও ‘প্রবাল দ্বীপ’ নামে পরিচিত, বিগত কয়েক দশকে সরকারি অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন এবং পর্যটনমূলক কার্যক্রমের কারণে প্রবালের অবস্থা ভঙ্গুর ও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। তবে পর্যটন বন্ধ থাকার সময় প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজের রূপে ফিরে আসে এবং দ্বীপটির বাস্তুতন্ত্র কিছুটা পুনর্জীবিত হয়। সেন্টমার্টিনকে সঠিকভাবে বাঁচিয়ে রেখে সংরক্ষণ করা গেলে শুধু দ্বীপটিই নয়, আমাদের প্রবাল বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ুরও দীর্ঘমেয়াদি উপকার হবে। প্রবাল উপকূলকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা দেয়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে এটি পর্যটন, মৎস্য ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক জীবিকা রক্ষায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের যাত্রায় আমি সেন্টমার্টিনের মৎস্যজীবীদের জীবন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তাদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখেছি, এমনকি সদ্য ধরা সামুদ্রিক জীবন্ত মাছ নিজের হাতে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এ মৌসুমে প্রচুর তরমুজ হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই তরমুজ খাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। পাশাপাশি আমার খাবারের তালিকায় ছিল টাইগার ফিশ, কোরাল মাছ, রূপচাঁদা, কালোচাঁদা, স্যামন, ফ্লাইং ফিশসহ নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, যা এই ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
টেকসই পর্যটনের জন্য আমাদের সবার দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। পর্যটক হিসেবে আমাদের উচিত প্লাস্টিক ও আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলা, কোরাল, শামুক, ঝিনুক বা প্রাকৃতিক কিছু স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে না নেওয়া। উচ্চ শব্দে গান না বাজানো এবং স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো। একই সঙ্গে প্রশাসনের উচিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে আরও কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
লেখক: শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, পরিবেশগত সুবিচার ও টেকসই উন্নয়বিষয়ক সমন্বয়কারী, ইয়ুথনেট গ্লোবাল
