সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর তালিকায় নজর দিলে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়, তা হলো প্রায় প্রতিটি দেশেরই সামরিক শক্তি অভাবনীয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অথবা কথিত সেই দুঃস্বপ্নের মাঝে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, বিশ্বমোড়লরা কীভাবে তাদের সামরিক শক্তির ঝুলি দিনদিন আরও ভারী করছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রায় অদৃশ্য এক কোণে বসে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে কিছুটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টি রাখার প্রচেষ্টাই ‘সামরিক শক্তির আদ্যোপান্ত’ সিরিজ। এই সিরিজে আজ থাকছে ইউক্রেনের সামরিক শক্তির বিস্তারিত।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
ইউক্রেনের সামরিক খাতের ইতিহাস সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটির সামরিক শক্তিতে ব্যাপক সংযোজন ও পরিমার্জন ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তৎকালীন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের বহর।
এক হাজার ৯০০টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পায় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। তবে ১৯৯৪ সালে বুদাপেস্ট স্মারকলিপির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে কূটনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে পারমাণবিক শক্তি পরিত্যাগ করে কিয়েভ।
এই ঘটনার পর আর্থিক বরাদ্দ ও আধুনিকায়নের অভাবে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার অনুপ্রবেশের ঘটনায় সবচেয়ে দুর্বল প্রতিপন্ন হয় দেশটির সামরিক বাহিনী। রাশিয়ার আধুনিক সামরিক শক্তির সামনে ইউক্রেনের মাত্র ছয় হাজার সৈন্য টিকতে পারেনি।
তবে এই সংকটই যেন ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা পূর্ব ইউরোপের দেশটির জন্য। সেনাবাহিনীতে ব্যাপক সংস্কারের পাশাপাশি জাতীয় এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর গঠনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে দেশটির সামরিক শক্তির ভাণ্ডার।
২০১৪ পরবর্তী পুনরুত্থান:
ক্রিমিয়া ও দনবাস অঞ্চলে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেনের সেনাবাহিনী নিজেদেরকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলেছে। ২০১৪ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বার্ষিক ব্যয় ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে এই বরাদ্দ প্রায় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়নে। এ ছাড়া সোভিয়েত আমলের পুরোনো অস্ত্র থেকে সরে এসে ন্যাটোর দেওয়া আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করে ইউক্রেন।
অতীতে দেশটিতে বাধ্যতামূলক সেনাশ্রম দিতে হতো তরুণদের। তবে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আরও পেশাদারিত্ব অবলম্বন করেছেন তারা।
এদিকে ন্যাটোর সহায়তায় উন্নত প্রশিক্ষণ পেয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। ২০২২ সাল নাগাদ জয়েন্ট মাল্টিন্যাশনাল এক্সটেনসিভ ট্রেনিংয়ের অধীনে প্রায় ১০ হাজার ইউক্রেনীয় সৈন্য আধুনিক যুদ্ধপরিস্থিতির কার্যকরী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
এ ছাড়া দেশটির প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করতে নেপচুন অ্যান্টি শিপ মিসাইল সিস্টেম এবং মাল্টিপল রকেট লঞ্চ সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তাদের সামরিক বাহিনী।

২০২৪ সালে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা:
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইন্ডেক্সের (জিএফপিআই) তথ্যমতে, ১৪৫টি দেশের মধ্যে সামরিক শক্তিতে ১৮তম অবস্থানে রয়েছে ইউক্রেন। দেশটির সরাসরি সেনাবাহিনীর সদস্য প্রায় ৯ লাখ। তাছাড়া ১২ লাখ সেনা রাখা হয়েছে সংকটাপন্ন পরস্থিতি মোকাবিলায়। এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কাজ করছেন দুই লাখ সেনা।
সামরিক বাহিনীর এই শক্তিশালী ও বৃহৎ গঠন প্রতিরক্ষার বিষয়ে দেশটির ছাড় না দেওয়ার মানসিকতার প্রতিফলন। এই নীতির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছেন দেশের বেসামরিক নাগরিকরা।
সেনাবাহিনী:
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর অস্ত্রবহরে এক হাজার ৭০০টি শক্তিশালী ট্যাংক রয়েছে। এরমধ্যে নিজেদের তৈরি টি-৬৪বিভিএস ট্যাংকের পাশাপাশি রয়েছে পশ্চিমা রাষ্ট্র থেকে সংগৃহীত লেপার্ড-২ ও এম-১ আব্রামস ট্যাংক।
সম্মুখযুদ্ধের পরিস্থিতি সামলাতে ২২ হাজারেরও বেশি সাঁজোয়া যান রয়েছে তাদের। এ ছাড়া শক্তিশালী ‘হিমার্স রকেট লঞ্চার’ দিয়ে ইউক্রনের সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ আঘাত হানতে সক্ষম।
বিমান বাহিনী:
ইউক্রেন বিমান বাহিনীর অস্ত্রবহরে ৩০০টি যুদ্ধ বিমানের মধ্যে সোভিয়েত আমলের এমআইজি-২৯এস ও এসইউ-২৭এস-এর পাশাপাশি রয়েছে তুর্কির তৈরি আধুনিক প্রযুক্তি বেরাক্তার টিবি-২ ড্রোন।
সাম্প্রতিক সামরিক সহায়তার ফলে শক্তিশালী এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও যুক্ত হয়েছে এই বহরে। ২০২৪ সালেই এই ফাইটার জেট ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষাখাতে বিমান বাহিনী কয়েক স্তরের আকাশ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন করেছে। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় নাসামস, প্যাট্রিয়ট মিসাইল এবং জার্মান আইরিস-টি ইউনিট ব্যবহারে বেশ সফলতা পেয়েছে তারা।

নৌ বাহিনী:
ভূমধ্যসাগরীয় কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার আধিপত্য সত্ত্বেও ইউক্রেনের নৌবাহিনী সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। চালকবিহীন ড্রোন এবং দেশে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ‘নেপচুন মিসাইল’ ব্যবহার করে ২০২২ সালে রাশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ মক্সভা ডুবিয়ে দেয় তারা।
ইউক্রেনের সামরিক নীতি:
দেশটির সামরিক নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা। এই উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ শহর, স্থাপনা এবং সীমান্তঅঞ্চলে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইউক্রেনের সামরিক নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো- দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন। এই উদ্দশ্যে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশ্চিমের বিভিন্ন শক্তিশালী প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ফলস্বরূপ অস্ত্রবহরের নিয়মিত আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
বাধার মুখে ইউক্রেন:
উল্লেখযোগ্য উন্নতি সত্ত্বেও বেশ কিছু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দুই বছরের বেশি সময় ধরে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধে সামরিক ব্যয় সামলাতে গিয়ে ইউক্রেনের অর্থনীতিতে চাপ পড়ছে। যুদ্ধের দুই বছরে দেশটির অর্থনীতিতে প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে।
দেশটির আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির প্রায় ৭০ শতাংশই ন্যাটোর সহায়তায় পাওয়া। ফলে মিত্র রাষ্ট্রগুলো সহায়তা বন্ধ করে দিলে চরম সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া রাশিয়ার তুলনায় পারমাণবিক খাতে ইউক্রেনের অবস্থান খুবই দুর্বল। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়ও রাশিয়ার চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে আশে দেশটি।

আক্রমণ মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ:
আধুনিক অস্ত্র বহরের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর দৃঢ়তার ওপর ভর করেই টিকে আছে ইউক্রেন। বেসামরিক প্রতিরোধ সংগঠন, ড্রোন প্রযুক্তির বিপুল ব্যবহার এবং পশ্চিমা মিত্রশক্তির সঙ্গে গোপন তথ্যের সমন্বিত আদান-প্রদানের মাধ্যমে রাশিয়ার আগ্রাসন বেশ কার্যকর ভাবেই প্রতিহত করছে দেশটি।
এ ছাড়া রাশিয়ার সাইবার হামলা মোকাবিলা করতে ইউক্রেনের সাইবার প্রতিরক্ষা ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট:
বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্ববহ। বিশ্বের অন্যতম সামরিক শক্তিধর দেশটিকে ঠেকিয়ে রাখার মাধ্যমে আধুনিক যুদ্ধনীতিতে ব্যাপক রদবদল ঘটাতে সক্ষম হয়েছে আপাতদৃষ্টিতে ছোট এই দেশটি। বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সংহতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদের স্থাপন করেছে ইউক্রেন।
পারমাণবিক প্রেক্ষাপট:
১৯৯৪ সালে পারমাণবিক শক্তি ও গবেষণা পরিত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাস রচনা করে ইউক্রেন। আন্তর্জাতিকভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইউক্রেন স্বাক্ষরিত এই চুক্তি উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবে পরবর্তী সময়ে দেশের প্রতিরক্ষা খাতের পতন এ ধরণের চুক্তির দুর্বলতাই প্রকাশ করে।
ভবিষ্যত:
কার্যকর ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও ইউক্রেনের সামরিক সংস্কার সম্পূর্ণ হয়েছে বলে এখনো বলা যাবে না। আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত অস্ত্রপ্রযুক্তির উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশটির সামরিক খাতের আরও শক্তিশালী অবস্থান অর্জনের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তাদের সামরিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বর্হিবিশ্বের সহায়তার ওপর নির্ভর করায় যেকোনো সময় নৈরাজ্য ভর করতে পারে অঞ্চলটিতে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের বিভবশক্তি ধারণ করছে ইউক্রেন। ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় ইউক্রেন নিজেদের দৃঢ়তা বজায় রাখবে এই আশা রাখছে খবরের কাগজ।
সূত্র: স্ট্যাটিস্টা মিলিটারি কম্পারিজন, ন্যাটো পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলি রিপোর্টস, কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস, গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইন্ডেক্স।
নাইমুর/পপি/অমিয়/