সমসাময়িক প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে শুরু করে মনোরঞ্জনসহ প্রাত্যহিক জীবনের বেশিরি ভাগ ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে এ অভ্যাস কখন আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা লক্ষ্য করার আগেই আমাদের সার্বিক মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়ে গেছে।
এই আসক্তি ছাড়তে স্বপ্রণোদিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি ছাড়তে নিচের আটটি পরামর্শ আপনার জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে-

মন শক্ত করুন:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খারাপ প্রভাবগুলোর কথা নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। এই আসক্তি ছাড়ার মাধ্যমে আপনি নিজের কোন কোন ক্ষেত্রে সংশোধন চান, তা নিয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলুন। ধরুন, আপনার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে ইনস্টাগ্রামে নোটিফিকেশন এলো কি না। এ সময় আপনি নিজেকে বলতে পারেন, ‘এখন যদি আমি ইন্টারনেটে না ঢুকে ছবি আঁকি, তা হলে মনটা আরও ভালো হয়ে যাবে।’
এ ছাড়া দিনের শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন না। ফোনে কিছু বিল্ট-ইন প্রযুক্তি থাকে। এগুলোর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
আপনি যদি ফেসবুক ব্যবহারের জন্য দিনে এক ঘণ্টা সময় ঠিক করে নেন, তা হলে এ সময়ের বেশি ব্যবহার করতে গেলে এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ফেসবুক অ্যাপ্লিকেশনটি বন্ধ করে দেবে।
ঘরে সোশ্যাল মিডিয়ামুক্ত এলাকা তৈরি করুন:
ঘরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় কোনো পরিস্থিতিতেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার না করার প্রতিজ্ঞা করুন। ধরুন আপনি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলেন- শোবার ঘরে আপনি কখনোই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন না। তা হলে দেখা যাবে, রাতে শুয়ে ফোন ব্যবহারের অভ্যাসটা কিছুদিনের মধ্যে কেটে যাবে। এভাবে আপনার অনলাইন ও বাস্তব জীবনের মধ্যে একটা স্বাস্থ্যকর দূরত্ব থাকবে।
ঘরের এই অংশে আপনি বরং বই পড়তে পারেন অথবা শরীরচর্চা করতে পারেন। এ ছাড়া আরও কতকিছুই তো আছে করার মতো।

ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন:
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপলিকেশনের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন। কিছুক্ষণ পর পর নোটিফিকেশনের আওয়াজ পেলে তো ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্ক্রল করতে ইচ্ছে করবেই। তাই মনোযোগ বাড়িয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকতে হলে ফোনের নোটিফিকেশন অ্যালার্ট বন্ধ রাখুন।
তবে অনলাইন প্রোফাইলগুলো থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়াও কাজের কথা নয়। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে একদিকে আপনার সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারও নিয়ন্ত্রণে থাকল, অন্যদিকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগও ঠিক রইল।
কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন:
ফেসবুকে লগইন করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন আপনি কী উদ্দেশ্যে ঢুকতে চাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশির ভাগ প্ল্যাটফর্মই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন আমরা এক কাজে এসে মাকড়সার জালের মতো গোলকধাঁধায় পড়ে উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং করতে শুরু করি।
খেয়াল করলে দেখবেন, হয়তো পরের দিনের ক্লাস রুটিন জানতে মেসেঞ্জারে ঢুকেছেন, এর মধ্যে টুং করে একটা নোটিফিকেশন এলো- ‘... ফোনালাপ ফাঁস’। ব্যস, ভিডিওতে ক্লিক করার পর হঠাৎ খেয়াল করবেন ফোন হাতে নেওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে আপনি পান্ডাদের বাঁশ খাওয়া থেকে শুরু করে আইফোনের নতুন মডেলের রিভিউ পর্যন্ত দেখে ফেলেছেন।
এ ধরনের অর্থহীন স্ক্রলিংয়ের অভ্যাস বন্ধ করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢোকার আগে অবশ্যই নিজেকে মনে করান আপনি কেন ঢুকতে চাচ্ছেন।
একটা নির্দিষ্ট সময় ফোন থেকে দূরে থাকুন:
প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা এবং সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিনে ফোন থেকে দূরে থাকুন। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে একটু দূরে থাকলে অনলাইন জগতের সঙ্গে আপনার একটা স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক বজায় থাকবে এবং নির্ভরতা কমবে।
এর চেয়ে বরং বাস্তবে বন্ধুদের সঙ্গে অথবা কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটান। এ সময়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজও করতে পারেন। অর্থপূর্ণ জীবনব্যবস্থা তৈরি করতে এ উপায় খুবই কার্যকরী।

বন্ধুদের সহযোগিতা নিন:
আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমানোর বিষয়ে বন্ধু ও স্বজনদের সহযোগিতা নিতে পারেন। তারা আপনার পদক্ষেপগুলোতে অনুপ্রেরণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
এ ছাড়া আসক্তি কমাতে মানসিক সহায়তা দেয় এমন সংস্থার পরামর্শও আপনার কাজে লাগতে পারে। যারা একই সমস্যায় ভুগছেন, তাদের অভিজ্ঞতা শুনলে আপনার পথ কিছুটা সহজ হবে।
প্রযুক্তি নিজের কাজে লাগান:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি কমাতে কিছু অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা যায়। ফরেস্ট, স্ক্রিন টাইমের মতো অ্যাপ্লিকেশন ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় রেকর্ড করে আপনাকে জানাবে দিনে গড়ে কতক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছে। এসব অ্যাপ ব্যবহার করে আপনি নিয়মিত অনলাইন থেকে দূরে থেকে বাস্তব লক্ষ্যগুলো অর্জনে মনোযোগী হতে পারবেন।
এ ছাড়া আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিডে কী ধরনের কনটেন্ট দেখবেন, এটাও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ইতিবাচক ও অর্থপূর্ণ কনটেন্ট দেখার চেষ্টা করুন। এতে যতক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, সেটাও শিক্ষণীয় কাজে লাগবে।

নিজের যত্ন নিন:
প্রাত্যহিক রুটিনে নিজের যত্ন নেওয়ার জন্যে আলাদা একটা সময় রাখুন। ধ্যান, যোগব্যায়াম অথবা শরীরচর্চার মাধ্যমে আসক্তি কাটানো সম্ভব। এতে আপনার জীবনের অর্থপূর্ণ লক্ষ্যগুলো অর্জনে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারবেন।
তবে তাড়াহুড়ো করবেন না। মনে রাখবেন, কোনো অভ্যাসই একদিনে ছাড়া যায় না। তাই ধৈর্য ধরে প্রতিদিন ছোট ছোট পদক্ষেপে এগোতে হবে। একদিন খেয়াল করবেন আসক্তি কেটে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কাটানো সময়সাপেক্ষ বিষয়। শুরুতে কঠিন মনে হলেও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে আপনি অবশ্যই এই আসক্তি কাটিয়ে উঠতে পারবেন। এক্ষেত্রে আশপাশের মানুষ অথবা অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ার শেকল থেকে বেরিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনব্যবস্থায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে এই লেখা আপনার জন্য কার্যকরী হবে বলে প্রত্যাশা রইল।
নাইমুর/পপি/অমিয়/