বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের কথা জানানো হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘বড় জয়’ বলে দাবি করেছেন। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার জন্য এই চুক্তিতে ইরানকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আর্থিক ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা এটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একপ্রকার আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন।
কয়েক দিন আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে আক্রমণের হুমকি দিচ্ছিলেন। তবে গত বুধবার তার বক্তব্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর দেখা গেছে। তিনি বলেন, বেসামরিক ব্যবহারের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মৌলিক অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো চাপ দেবে না। ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ এখন ফেরত দিতে হবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এবং চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে ইসরায়েল এবং রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হতে পারে। কট্টরপন্থিরা ট্রাম্পকে তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। অন্যদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এই চুক্তিকে একটি ‘মহাবিজয়’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।
বুধবার তেহরান থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আজ শুক্রবার জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই চুক্তি নিয়ে ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এই চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার একটি দলিল। মানুষ এটি দেখবে ও বিচার করবে।
নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তার মতো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগে ইরানের প্রতি এত কঠোর হননি। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এই চুক্তি না হলে বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি হতো। তার মতে, চুক্তি না হলে হরমুজ প্রণালি কখনোই উন্মুক্ত হতো না। তিনি বলেন, মাথার ওপর যখন রকেট ওড়ে এবং চারদিকে মাইন ছড়ানো থাকে, তখন কেউ শত কোটি ডলারের জাহাজ সেখানে ভাসাতে চায় না।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখবে। ইরান তাদের ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমিয়ে ফেলার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে। এই ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব ছিল। ট্রাম্প জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই এই মজুত কমিয়ে ফেলার বিষয়ে তিনি সম্মত আছেন।
জি-সেভেন সম্মেলনের শেষে ট্রাম্প যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন মার্কিন কর্মকর্তারা এই ১৪ দফা পরিকল্পনার কথা বিস্তারিত জানান। এটি মূলত একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি। আরও স্থায়ী শান্তি ও পারমাণবিক আলোচনার পথ তৈরি করতে মার্কিন প্রশাসন প্রথমে এই চুক্তির মূল পাঠ প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব করেছিল।
এই চুক্তির ফলে ইরান বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবে। ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হবে। এ ছাড়া ইরান যাতে বিদেশে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারে, সেজন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর থেকে সব আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ও অবরুদ্ধ সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থায়নে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও এই চুক্তিতে রয়েছে।
তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ দেবে না বলে ট্রাম্প রাগান্বিতভাবে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর এই অর্থায়ন ইরানের ভালো আচরণের ওপর নির্ভর করবে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যে কেউ চাইলে বিনিয়োগ করতে পারে। আমি কি বলব যে কেউ বিনিয়োগ করতে পারবে না? তবে আমরা কোনো বিনিয়োগ করছি না। আমরা ১০ সেন্টও দিচ্ছি না।’
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ছিল ইরানের একটি অন্যতম প্রধান দাবি। এর ফলে ইসরায়েল লেবাননে কোনো সামরিক অভিযান চালাতে পারবে না। চুক্তিতে লেবাননের ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতা’ বজায় রাখার একটি ধারা রয়েছে। তবে এর ফলে ইসরায়েল লেবাননে তৈরি করা তাদের ‘বাফার জোন’ বা অন্তর্বর্তী অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে কি না, তা মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেননি।
এর বিনিময়ে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহসহ তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। চুক্তির অধীনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগামী ৬০ দিন বিনা টোলে বা বিনা মূল্যে জাহাজ চলাচল করতে পারবে। তবে ইরানের আলোচক গালিবাফ জানিয়েছেন, ৬০ দিন পার হওয়ার পর ইরান এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায় করবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালি আর যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাবে না। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে ও সেবামূলক কাজের জন্য আমরা অবশ্যই ফি নেব।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুজান ম্যালোনি এই চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই প্রশাসনের পক্ষে এত কম সময়ে পারমাণবিক বিষয়ের মতো জটিল ও বিস্তারিত চুক্তি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। তিনি মন্তব্য করেন, এই চুক্তিতে ইরান শুরুতেই অনেক বেশি সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। তারা নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই তেল রপ্তানি করতে পারবে, যা এই মুহূর্তে অবাস্তব মনে হচ্ছে। এর ফলে ইরান খুব দ্রুত প্রচুর অর্থ উপার্জন করবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান