একসময় যুদ্ধ বলতে বোঝাত ট্যাংক, মেশিনগান, কামান আর যুদ্ধবিমানের লড়াই। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় পাল্টে গেছে সেই ধারা। এখন আধুনিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও অস্ত্র দুটি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এর আগে তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। তাতে প্রচলিত অস্ত্র ট্যাংক, কামান, মেশিনগান আর যুদ্ধবিমানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময় এখন পাল্টে গেছে। দেশ দুটি এখন পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। চলমান ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে চালকবিহীন ড্রোন হয়ে উঠেছে লড়াইয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ভারত-পাকিস্তানে পাল্টাপাল্টি হামলায় ড্রোন ব্যবহার হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ড্রোনযুদ্ধ শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ভারতের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা কয়েক ঘণ্টায় ২৫টি ভারতীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য বিশ্বশক্তি যখন সংযমের আহ্বান জানাচ্ছে, তখন এই অঞ্চলটি উত্তেজনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে।
আমেরিকার নৌযুদ্ধ কলেজের অধ্যাপক জাহারা মাতিসেক বিবিসিকে বলেন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত একটি নতুন ড্রোন যুগে প্রবেশ করছে।
পাকিস্তান জানিয়েছে, গত বুধবার ভোর থেকে ভারতীয় বিমান হামলা এবং সীমান্তের ওপার থেকে গুলিবর্ষণে পাকিস্তানের পাঞ্জাব, করাচি ও আজাদ কাশ্মীরে ৩৬ জন নিহত এবং ৫৭ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে পাকিস্তানের হামলায় কমপক্ষে ১৬ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। ভারত দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল গত মাসে পাহালগামে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর একটি মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ। একই সঙ্গে ভারতের হামলাকে ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ ও ‘যুদ্ধের কর্মকাণ্ড’ উল্লেখ করে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামাবাদ।
গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ঘোষণা করেছে, তারা করাচি, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডিসহ বিভিন্ন শহরে ২৫টি ভারতীয় ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। ইসরায়েলের তৈরি ‘হারোপ’ ড্রোনগুলো প্রযুক্তিগত ও অস্ত্রভিত্তিক পাল্টা ব্যবস্থা উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। ভারত দাবি করেছে, তারা বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত করেছে এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের ড্রোনবহরে ইসরায়েলের নির্মিত গোয়েন্দা ড্রোনের সংখ্যা বেশি। যেমন: আইএআই সার্চার ও হেরন, এর সঙ্গে হার্পি ও হারোপ যুদ্ধাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে সেগুলো তৈরি হয়। ড্রোনগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে কাজ করে, স্বায়ত্তশাসিত গোয়েন্দা এবং নির্ভুল আঘাত করতেও সক্ষম।
লাহোরভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এজাজ হায়দার বিবিসিকে বলেন, পাকিস্তানের ড্রোনবহর ‘বিস্তৃত এবং বৈচিত্র্যময়’, যার মধ্যে দেশীয় এবং আমদানি করা উভয় ধরনের সিস্টেম রয়েছে। এই তালিকায় ‘এক হাজারেরও বেশি ড্রোন’ রয়েছে, যার মধ্যে চীন, তুরস্ক এবং দেশীয় নির্মাতাদের মডেল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে চীনা সিএইচ-৪, তুর্কি বায়রাকতার আকিনসি এবং পাকিস্তানের নিজস্ব বুরাক ও শাহপার ড্রোন।
ড্রোনগুলোকে শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ছদ্মবেশ তৈরি বা দমন করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, শত্রুর রাডার ধ্বংস করতে বিতর্কিত আকাশসীমায় উড়ে যেতে পারে। অধ্যাপক মাতিসেক বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়ই তাদের যুদ্ধে এভাবেই ড্রোনকে ব্যবহার করে। লক্ষ্যবস্তু তৈরি এবং ট্রিগার করা- এই দ্বৈত ভূমিকা মানববাহী বিমান ঝুঁকি না নিয়ে শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অবনমিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে ড্রোন।