প্রায় ৮০ দিন অবরুদ্ধ রাখার পর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় সামান্য ত্রাণ প্রবেশ করতে দিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। উপত্যকায় বসবাসকারী ১৯ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনির জন্য সোমবার মাত্র ৯টি ত্রাণবাহী ট্রাককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে।
আইডিএফের সরকারি কার্যক্রম সমন্বয় বিভাগের প্রধান ঘাসান এলিয়ান ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম আর্মি রেডিওকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন । আর্মি রেডিওকে তিনি বলেন, ' সোমবার ( ১৯ মে) গাজায় শিশুখাদ্য ও ত্রাণসামগ্রীবাহী ৯টি ট্রাক প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। গাজায় প্রবেশের আগে আমরা গাড়িগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করেছি।'
তিনি আরও জানান, ত্রাণবাহী এসব ট্রাক প্রথমে গাজার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুদামে যাবে। সেখানে মালপত্র খালাস হওয়ার পর জাতিসংঘ ও রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে এগুলো বিতরণ করা হবে।
এর মধ্যদিয়ে ১১ সপ্তাহের অবরোধ শেষ হলো। এ ছাড়াও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল গাজার সব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেবে এবং হামাস যাতে সেখানে প্রবেশ করে কোনো লুটপাট চালাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে গাজার খান ইউনিস ও তার আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। গত সোমবার ভোর থেকে পুরো উপত্যকায় অন্তত ৩০টি বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। এদিকে, গাজা এ মুহূর্তে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে। খান ইউনিসের এক বাসিন্দা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গাজার ভেতরের খাদ্যসংকট তীব্র পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিকভাবেও চাপ বাড়ছে।
ইসরায়েল গাজায় খাবার প্রবেশ করতে দেওয়ার কারণ হিসেবে জানিয়েছে, উপত্যকায় এরকম ‘ক্ষুধাসংকট’ দেখা দিলে তা ইসরায়েলের হামাসের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ)-এর পরামর্শেই গাজায় সীমিত সহায়তা ঢুকতে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, ইসরায়েল মানবিক সহায়তা বিতরণের নিয়ন্ত্রণ হামাসের হাতে দেবে না। তারা নিশ্চিত করবে যাতে হামাসের কেউ সহায়তা না পায়।
বিবিসির খবর বলছে, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় কোনো খাবার, জ্বালানি বা ওষুধ- কোনো কিছুই ঢুকতে পারেনি। এমন একটি সময় গাজায় সহায়তা ঢুকতে দেওয়ার এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে এল, যার এক দিন আগেই ইসরায়েল গাজায় নিজেদের অভিযানের পরিসীমা বাড়িয়েছে।
হাসপাতালে ইসরায়েলের হামলা
ইসরায়েল গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে বোমাবর্ষণ করেছে। এতে সেখানে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আর পুরো উপত্যকায় গতকাল সোমবার ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত অন্তত ৪৬ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে।
ইসরায়েলের আক্রমণের পর গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালের ছবি শেয়ার করেছে। সেসব ছবিতে দেখা গেছে, আক্রমণে নাসের হাসপাতালের ওয়্যারহাউস ধ্বংস হয়েছে। এমনিতেই সেখানে রসদের স্বল্পতা ছিল। তার ওপর এ হামলায় সংগ্রহে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জামও নষ্ট হয়েছে।
গাজার হাসপাতালগুলোর মহাপরিচালক ডক্টর মুহাম্মদ জাকৌত জানান, হাসপাতালের কর্মীরা ভীত যে, সেখানে আবারও অভিযান চালাতে পারে ইসরায়েলি সেনারা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ৫৩ হাজার ৪৮৬ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩৪। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে এসব তথ্য। তবে গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর বলছে, মৃতের সংখ্যা ৬১ হাজার ৭ শতাধিক হবে। গাজার বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ব্যক্তিদেরও মৃতের তালিকায় ধরেছে তারা।
এদিকে, ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের ফেরানোর চেষ্টা করছে। এখনো প্রায় ২৩ জন জিম্মি বেঁচে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জিম্মিদের পরিবারের গড়ে তোলা গ্রুপ বলছে, ইসরায়েলের অভিযানের কারণে জিম্মিদের জন্য ব্যাপক হুমকি তৈরি হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে গ্রুপটি জানায়, এ ধরনের অভিযান জিম্মিদের ক্ষতির আশঙ্কা নাটকীয় হারে বাড়িয়ে তুলবে। গ্রুপটি ওই প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বর্তমানে জীবিতদের হত্যা করা ও নিহতদের মুছে ফেলার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি বোমা, বিলম্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অদক্ষতা বিপদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আমরা যদি এভাবে চালাতে থাকি, তাহলে আমরা জীবিত ও মৃত দুটিই হারিয়ে ফেলব। আমাদের অবশ্যই সবাইকে ফিরিয়ে আনতে হবে।’ সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা