চলতি সপ্তাহে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরে অনুষ্ঠেয় ১৭তম ব্রিকস সম্মেলনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদের অনুপস্থিতি হবে চোখে পড়ার মতো। গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না। তার পরিবর্তে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। একইভাবে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও থাকছেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে পুতিনের পরিবর্তে রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। কারণ ব্রাজিলের আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী পুতিনকে গ্রেপ্তার করতে হবে। তবে শুধু আইনি বিষয় নয়, তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে আরও গভীর কারণ থাকতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনে জেতার পর থেকেই ব্রিকস জোট তার নজরদারির আওতায় এসেছে। জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক বিবৃতিতে বলেন- এই শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে, তারা কোনো ব্রিকস মুদ্রা তৈরি করবে না। বা ডলারের বিকল্প কোনো মুদ্রাকে সমর্থন দেবে না। যদি দেয় তাহলে ১০০ শতাংশ ট্যারিফের সম্মুখীন হতে হবে।
২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন নিয়ে গঠিত ব্রিকস-এ পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হয়। এখন এই জোটে ১০টি দেশ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশের আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে শুরু হওয়া এই জোট এখন কেবল উদীয়মান অর্থনীতির আলোচনা মঞ্চ নয়। বরং এটি আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়। এই লক্ষ্য মূলত তাদের মধ্যে থাকা কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর আশঙ্কা থেকে এসেছে। আশঙ্কাটি হলো- যদি যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে তারা কীভাবে তা প্রতিরোধ করবে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর বিষয়টি আরও জোরালো হয়। যখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। রাশিয়ান ব্যাংকগুলো সুইফট সিস্টেম থেকে বাদ পড়ে। রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও জব্দ করা হয়। তবে বছরের শুরু থেকে ট্রাম্পের হুমকি আরও তীব্র হয়েছে। জানুয়ারিতে তিনি বলেন- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্রিকস ডলারকে কখনোই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। যে দেশ চেষ্টা করবে, তারা যেন আমেরিকাকে বিদায় জানায় আর ১০০ শতাংশ ট্যারিফের জন্য প্রস্তুত থাকে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগে ট্রাম্প ঘোষণা দেন- ‘ব্রিকস মৃত’। তিনি আরও বলেন, যদি তারা ডলারের সঙ্গে খেলতে চায়, তাহলে ট্যারিফের ঝড়ে উড়ে যাবে। এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের ট্যারিফ ‘ব্লিট্জক্রিগ’ ব্রিকস জোটে ধাক্কা দেয়। ব্রাজিলিয়ান রাষ্ট্রদূত মৌরিসিও লিরিওর নেতৃত্বে সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ প্রতিক্রিয়া বিবৃতির পরিকল্পনা করেন। যেখানে একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করার কথা ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণে সেই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি। তার বদলে একটি সাধারণ ‘চেয়ার স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করা হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের আক্রমণ কৌশল কাজ করছে। ‘ডি-ডলারাইজেশন’ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে কোনো বিকল্প মুদ্রা তৈরি হয়নি। ব্রিকস সদস্যরাও একে একে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে। জানুয়ারির শেষদিকে পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ব্রিকস নিজস্ব মুদ্রা তৈরি করার পরিকল্পনা করছে না। তারা বরং যৌথ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়। একইভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের ডি-ডলারাইজেশন নিয়ে কোনো নীতি বা কৌশল নেই।’ এমনকি বর্তমানে ব্রিকস-এর সভাপতিত্বকারী দেশ ব্রাজিলও এই পরিকল্পনা ছেড়ে দিয়েছে।
ট্রাম্পের কঠোর বিরোধিতা ও সদস্য দেশগুলোর পরস্পরবিরোধী জাতীয় স্বার্থ এখন ব্রিকস জোটে ফাটল ধরাচ্ছে। সৌদি আরব ২০২৩ সালে আমন্ত্রণ পেলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ নিশ্চিত করেনি। সৌদি সরকার ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইলে ব্রিকস ত্যাগ করতে পারে- এটি জোটের জন্য বড় ধাক্কা হবে।
শি জিন পিং কেন এই সম্মেলনে যাচ্ছেন না তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। হতে পারে তিনি ব্রাজিলকে একধরনের ‘চাপ’ দিচ্ছেন। কারণ ব্রাজিল চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যোগ দেয়নি। অথবা সম্ভবত দেশীয় ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। তবে এমনও হতে পারে যে চীন ট্রাম্পকে আর চটাতে চায় না।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই ব্রিকস-এর বিরুদ্ধে তার ‘অপ্রচলিত যুদ্ধ’ চালিয়ে যাবেন। সম্ভবত তার লক্ষ্য- এই বিরুদ্ধ জোটের মধ্যে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, যাতে তারা আর একটি ঐক্যবদ্ধ ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করতে না পারে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ