পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী নীল তিমি, আগের মতো আর গান গাইছে না। তাদের এই নীরবতা বিজ্ঞানীদের চিন্তিত করে তুলেছে।
একটি গবেষণার কাজে গত ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে সমুদ্রের তলদেশে একটি হাইড্রোফোন (ধ্বনি সংগ্রাহক যন্ত্র) বসানো হয়। হাইড্রোফোনের মনিটরটি সমুদ্রের বিভিন্ন প্রাণীর শব্দ সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে একাধিক তিমি প্রজাতিও ছিল।
সমুদ্র তলদেশ থেকে সংগৃহীত ছয় বছরের সেই অ্যাকোস্টিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নীল তিমির গানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অ্যাকোস্টিক সংগ্রহের সময়কালেই নীল তিমির গান প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।
এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্লস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে একটি অস্বাভাবিক সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা বেরিং সাগর এবং আলাস্কা উপসাগর থেকে পূর্ব উত্তর আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত বয়ে চলা গরম পানির এই তাপপ্রবাহের নাম দিয়েছেন ‘দ্য ব্লব’।
এই ব্লব প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সাগর তলদেশে এক ধরণের বিষাক্ত শৈবাল ফুল ফোটে যা ক্রিল বা ক্ষুদ্র চিংড়ির মতো প্রাণী সহ অন্যান্য সামুদ্রিক জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।
এভাবেই সমুদ্রে ক্রিলের পরিমাণ আশংকাজনকহারে কমে গেছে। আর এই ক্রিলই হচ্ছে নীল তিমির প্রধান খাদ্য।
ব্লব চলাকালে মহাসাগরের কিছু কিছু জায়গায় তাপমাত্রা গড়ে ৪.৫ ফারেনহাইটেরও বেশি ছিল। ব্লবটি প্রশান্ত মহাসাগরের ৫০০ মাইল প্রশস্ত এবং ৩০০ ফুট গভীর অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল । ২০১৬ সালের মধ্যে এটি প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় ২০০০ মাইল জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
মন্টেরি বে অ্যাকুয়ারিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জীববিজ্ঞানী জন রায়ান ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে জানান, ক্ষুধার্ত অবস্থায় গান গাওয়া খুব কঠিন। তিমিরা এখন শুধুই খাবারের খোঁজে ছুটছে। গান গাওয়ার সময় বা শক্তি তাদের নেই।
গবেষণার সহলেখক ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী কেলি বেনোয়া-বার্ড জানান, এই উষ্ণ বছরগুলোতে শুধু তাপমাত্রাই নয়, পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র বদলে যায়। তখন ক্রিল জন্মায়নি। আর যারা শুধু ক্রিলের ওপর নির্ভর করে, তাদের সামনে কোনো পথ খোলা থাকে না।
এছাড়া, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলেই আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের মহাসাগরগুলো ইতোমধ্যে অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি শোষণ করছে। এর ফলে ক্রিলের মতো সূক্ষ্ম প্রাণীর বিলুপ্তি শুধু নীল তিমিই নয়, পুরো সামুদ্রিক খাদ্যচক্রকে বিপন্ন করে তুলছে।
একারণে, তিমিদের এই নীরবতা শুধু একটি প্রজাতির দুর্ভোগ নয়—এটি সমুদ্রের গভীরে চলা এক মহাসংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।
সুলতানা দিনা/