পর্বত পর্যটন বৃদ্ধি করতে এভারেস্টের পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০০টি অনাবিষ্কৃত দুর্গম শৃঙ্গ বিনামূল্যে আরোহণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে নেপাল । দ্য ইকোনোমিক টাইমসের খবর।
কম পরিদর্শন করা হয় এমন অঞ্চলে পর্বতারোহীদের আকৃষ্ট করার জন্যই দেশটির সরকার আগামী দুই বছরের জন্য কর্ণালি এবং পশ্চিম প্রদেশের ৯৭টি শৃঙ্গের জন্য রয়্যালটি মওকুফ করেছে। এই পদক্ষেপের ফলে ৫,৮৭০ মিটার থেকে ৭,১৩২ মিটার উচ্চতার এই পর্বতমালা সীমিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অঞ্চলগুলোতে পর্যটকদের আকর্ষণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নেপালের পর্যটন বিভাগের পরিচালক হিমাল গৌতম জানান, এই উদ্যোগ নেওয়ার উদ্দেশ্য হল প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও বেশি পর্যটক আনা, কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য আয় তৈরি করা । এছাড়া, এই উদ্যোগ নেপালের অনাবিষ্কৃত পর্বত গন্তব্যগুলোকে প্রচারের আওতায় আনতেও সাহায্য করবে।
নেপাল সরকার এভারেস্টের পর্বতারোহীদের জন্য কমপক্ষে ৭,০০০ মিটার উঁচু একটি শৃঙ্গে প্রথমে আরোহণ করা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও করেছে। পর্যটন আইনের সংশোধনীর অংশ হিসেবে এই প্রস্তাবটি বিবেচনার জন্য উচ্চকক্ষে পাঠানো হয়েছে এবং আইনে পরিণত হওয়ার আগে উভয় কক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
বছরের শুরুতে, নেপাল ঘোষণা করেছিল যে ৮,৮৮.৮৬ মিটার উঁচু মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণের জন্য প্রতি ব্যক্তির ফি ১১,০০০ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫,০০০ মার্কিন ডলার করা হবে, যা ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ থেকে কার্যকর হবে।
সোমবার (১১ আগস্ট) রাতে দ্য ইকোনোমিক টাইমস জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এভারেস্ট আরোহীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিড়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গে আরোহণের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
অথচ নেপালের পশ্চিমাঞ্চলের কারনালি ও সুদূর পশ্চিম প্রদেশে রয়েছে ৫ হাজার ৮৭০ মিটার থেকে ৭ হাজার ১৩২ মিটার উচ্চতার অসংখ্য শৃঙ্গ। এসব শৃঙ্গ পর্বতারোহীদের কাছে এখনো অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। এভারেস্টের উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার হলেও অন্য শৃঙ্গগুলোতে আরোহণ সমান রোমাঞ্চকর হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অতীতে নেপালের দূরবর্তী অঞ্চলে ট্রেকিং বা অভিযানের জন্য কঠিন ও ব্যয়বহুল অনুমতির প্রয়োজন হতো। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সেখানে পৌঁছাতেও লেগে যেত কয়েক দিন। তারপর শুরু হতো ট্রেকিং।
এখন ওই ৯৭টি শৃঙ্গের জন্য কোনো পারমিট ফি লাগবে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গগুলো হলো—এপি ওয়েস্ট, সাইপাল, ফির্নকফ ও বোবায়ে চুলি।
এভারেস্ট, লোৎসে ও কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত নেপালের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় পর্যটনও মূলত ওই অঞ্চল দুটিতে সীমাবদ্ধ। দেশটির পশ্চিমাঞ্চল অবহেলিত থেকে গেছে মূলত খারাপ রাস্তা, দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে।
নেপালের পর্যটন বিভাগের মুখপাত্র লিলাধর আওয়াস্থী বলেছেন, ‘আমরা চাই অভিযাত্রীরা কারনালি ও সুদূর পশ্চিমের অমলিন প্রকৃতি উপভোগ করুক। এতে স্থানীয় লোকদের মধ্যে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরি হবে।’
তবে ওই অঞ্চলগুলোতে পৌঁছানোর সহজ কোনো পথ নেই। কাঠমান্ডু থেকে প্রথমে যেতে হবে বিমানে, পরে আবার কয়েক ঘণ্টার গাড়ি ভ্রমণ, এরপর কয়েক দিনের হাঁটা। অন্যদিকে এভারেস্ট যে অঞ্চলে অবস্থিত, সেখানে হেলিকপ্টারে চড়ে সহজেই পৌঁছানো যায় এবং বেজক্যাম্পে শহরের মতোই সব সুবিধা পাওয়া যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এভারেস্টে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির হার বেড়েছে। তাই ভিড় কমাতে দেশটির সরকার ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে এভারেস্টে আরোহণের ফি ১১ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৫ হাজার ডলার করছে। অর্থাৎ আগামী মাস থেকে বাংলাদেশি কেউ যদি এভারেস্টে আরোহণ করতে চান, তাহলে তাঁর শুধু অনুমতি নিতেই খরচ হবে ১৮ লাখ ২২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া দেশটির ৭ হাজার ১ মিটার থেকে ৭ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতার কোনো শৃঙ্গে আরোহণের অনুমতি নিতে খরচ হবে ৮০০ ডলার (প্রায় ১ লাখ) এবং ৫ হাজার ৪০০ মিটার থেকে ৭ হাজার মিটারের শৃঙ্গে আরোহণের অনুমতি মিলবে ৫০০ ডলারে (৬০ হাজার টাকা)। তবে নতুন উন্মুক্ত ৯৭টি শৃঙ্গের জন্য কোনো ফি লাগবে না।
নেপালে মোট ৩ হাজার ৩১০টি শৃঙ্গ রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির উচ্চতা ৫ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি। এর মধ্যে ৮ হাজারের বেশি উচ্চতার আটটি শৃঙ্গও রয়েছে সেখানে।
তবে, নতুন উন্মুক্ত শৃঙ্গগুলো আরোহণে পর্বতারোহীদের কোনো ফি না লাগলেও ওই অঞ্চলগুলোতে ট্রান্সপোর্ট, অবকাঠামো ও সঠিক তথ্যের অভাব তাঁদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সুলতানা দিনা/