অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ দেশটির দুটি ইহুদিবিরোধী হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে অভিযুক্ত করেছেন। একই সঙ্গে ক্যানবেরায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীতে সাংবাদিকদের সামনে আলবানিজ বলেন, ‘‘গত বছর সিডনি ও মেলবোর্নে সংঘটিত হামলাগুলো ছিল। ‘একটি বিদেশি জাতির পরিচালিত বিপজ্জনক আগ্রাসনের কাজ’। যার লক্ষ্য ছিল অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সংহতি দুর্বল করা।” তিনি আরও বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। অস্ট্রেলিয়ান সরকার দৃঢ় ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছি, তাকে বহিষ্কার করা হবে।’
আলবানিজ জানান, অস্ট্রেলিয়া তেহরানে অবস্থিত তার দূতাবাসের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। সব কূটনীতিককে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরিত করেছে। তিনি ঘোষণা দেন, সরকার শিগগিরই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে আইন প্রণয়ন করবে।
অস্ট্রেলিয়ান কর্মকর্তাদের মতে, সিডনির লুইস কন্টিনেন্টাল কিচেনে গত বছরের ১০ অক্টোবর। মেলবোর্নের অ্যাডাস ইসরায়েল সিনাগগে ৬ ডিসেম্বর হামলা চালানো হয়। কোনোটিতেই হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও হামলাকারীরা ভবনে আগুন ধরিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানান, ইরানের রাষ্ট্রদূত আহমেদ সাদেঘি। তার তিন সহকর্মীকে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করে দেশ ছাড়ার জন্য সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া কোনো রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করছে। পাশাপাশি দেশটি তেহরান থেকে নিজের রাষ্ট্রদূতকেও প্রত্যাহার করেছে।’
তবে অস্ট্রেলিয়া কিছু সীমিত কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে। ওং বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকদের দেশে ফিরে আসতে বলা হয়েছে। যারা ইরান ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন তাদের সে সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করা হয়েছে।’
হামলার পেছনে আইআরজিসি?
অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের (এএসআইও) প্রধান মাইক বার্গেস বলেন, ‘ক্যানবেরায় নিযুক্ত ইরানি কূটনীতিকরা সরাসরি হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে গোয়েন্দা তথ্য বলছে, আইআরজিসি ধারাবাহিক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে থাকা লোকদের এ হামলা চালাতে নির্দেশ দিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘ইরানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শাখা আইআরজিসি তাদের সম্পৃক্ততা আড়াল করতে ‘জটিল প্রক্সি জাল’ ব্যবহার করেছে। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে অন্যান্য ইহুদিবিরোধী হামলায়ও আইআরজিসির সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সব হামলায় ইরান জড়িত ছিল না।’
ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্যেই পদক্ষেপ
অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। এর মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিল ক্যানবেরা।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে আলবানিজকে আক্রমণ করে বলেন, ‘তিনি একজন দুর্বল রাজনীতিবিদ, যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার ইহুদিদের পরিত্যাগ করেছেন।’
অস্ট্রেলিয়ান সরকার নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, ‘আপনি কতজন মানুষকে উড়িয়ে দিতে পারেন বা কত শিশুকে অভুক্ত রাখতে পারেন, তার দ্বারা শক্তি মাপা হয় না।’
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন জোটের অতি-ডানপন্থি মাফদাল-রিলিজিয়াস জায়নিজম পার্টির এমপি সিমচা রথম্যানের ভিসা বাতিল করেছে। কারণ তার পরিকল্পিত সফরের উদ্দেশ্য ছিল ‘বিভেদ ছড়ানো’। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অস্ট্রেলিয়ান কূটনীতিকদের ভিসা বাতিল করেছে।
‘কঠোর অবস্থান দেখাতে চায় সরকার’
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অস্ট্রেলিয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মার্ক কেনি বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে আলবানিজ সরকারের পদক্ষেপ আংশিকভাবে ইহুদিবিরোধী মনোভাব দমনের ইচ্ছা থেকে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহুর মন্তব্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় শক্তিশালী ইহুদি সম্প্রদায় রয়েছে। সরকার একদিকে কঠোর অবস্থান প্রদর্শন করতে চাইছে, অন্যদিকে গোয়েন্দা তথ্যও গুরুতর।’ কেনি আরও বলেন, ‘যদি গোয়েন্দা তথ্য সত্যি হয়, তবে অস্ট্রেলিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার পেছনে রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার। যেকোনো সরকারই এর বিরুদ্ধে স্পষ্ট পদক্ষেপ নেবে।’
তিনি জানান, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করা হলে অস্ট্রেলিয়ায় তাদের যেকোনো কার্যক্রম ঠেকানো সহজ হবে। ‘এটি তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও দমনকে অগ্রাধিকার দেবে। কূটনীতিক বহিষ্কার ও সম্পর্ক ছিন্নের ফলে গোপনে কাজ চালানো ইরানিদের জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যাবে।’ সূত্র: আল-জাজিরা