রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইউক্রেনে রাশিয়ার হয়ে লড়াই করা তার সেনাদের সাহসিকতার জন্য।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দুই নেতার বৈঠক হয়। সেখানে এশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীনের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে কিম জং উনের অংশগ্রহণ। তিনি সচরাচর উত্তর কোরিয়া ছেড়ে যান না এবং খুব কমই অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দেখা করেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ চালিয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করা পুতিন বলেন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পিয়ংইয়ংয়ের সেনারা কুরস্ক অঞ্চল মুক্ত করতে সহায়তা করেছে।
পুতিন কিমকে বলেন, ‘‘আপনার সেনারা সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে লড়েছে। আমি উল্লেখ করতে চাই, আপনার সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের পরিবার যে আত্মত্যাগ করেছে, আমরা তা কখনও ভুলব না।’’
পুতিনের এ স্বীকৃতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন কিমও। তিনি বলেন, ‘‘দুই দেশের সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে উন্নতি করছে এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার সঙ্গে ‘যৌথ সংগ্রামে পিয়ংইয়ংয়ের অংশগ্রহণ তার প্রমাণ।’’
কিম আরও বলেন,রাশিয়াকে সহায়তা করার কোনো সুযোগ থাকলে আমরা তা অবশ্যই ভ্রাতৃসুলভ দায়িত্ব হিসেবে পালন করব।
দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া প্রায় ১৫ হাজার সেনা পাঠিয়েছে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে, সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র। এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া খাদ্য, অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে।
এই সেনারা রাশিয়ার পশ্চিম কুরস্ক পুনর্দখলের অভিযানে যুক্ত হয়েছে, যেখানে গত বছরের আগস্টে আকস্মিক আক্রমণে দখল করা সীমিত অঞ্চল রক্ষায় লড়ছে ইউক্রেনীয়রা। ধারণা করা হয়, এতে উত্তর কোরীয় বাহিনী বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানায়, শুধু তিন মাসেই অন্তত এক হাজার সেনা নিহত হয়েছে। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার আইনপ্রণেতারা বলেন, মোট ১৫ হাজার সেনার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ জন হতাহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬০০ জন নিহত। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকা এসব সেনা প্রথমে রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নেয় এবং পরে সহায়ক ভূমিকায় যুক্ত হয়।
বেইজিংয়ের তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে কিম জং উনকে দেখা যায় শি জিনপিং ও পুতিনের পাশে হেঁটে প্রবেশ করতে এবং পরে তাদের পাশে বসতে। তিনজনকে আরামদায়কভাবে কথোপকথন করতে দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে কিম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন, তিরস্কৃত ও বিদ্রূপের পাত্র হলেও আজ তিনি বিশ্বের দুই প্রভাবশালী নেতার সমকক্ষ আসনে বসেছেন। শি ও পুতিনের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগই ছিল তার এ কুচকাওয়াজে যোগ দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য। এই উপস্থিতির মাধ্যমে নেতারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন পশ্চিমা বিশ্বকে—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে—যে তারা এখন ঘনিষ্ঠ মিত্র।
এটি ছিল দুই বছরে পুতিন ও কিমের তৃতীয় সাক্ষাৎ, এমন সময়ে যখন রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া তাদের সহযোগিতা আরও গভীর করছে। গত জুনে তারা একটি চুক্তি করে, যাতে বলা হয়, দুই দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসন’ চালানো হলে অপর দেশ সাহায্যে এগিয়ে আসবে। কিম একে বলেছিলেন ‘এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী’ চুক্তি। কিছুদিন আগে তিনি রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে তার ‘নিঃশর্ত সমর্থন’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এপ্রিল মাসে প্রথমবার প্রকাশ্যে জানায় উত্তর কোরিয়া যে তারা রাশিয়ায় সেনা পাঠিয়েছে, যদিও এর অনেক আগে ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক সেনা মোতায়েনের খবর প্রকাশ করেছিল। শুধু সেনা নয়, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত কুরস্ক অঞ্চল পুনর্গঠনে হাজারো শ্রমিক পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বলে জুনে জানায় মস্কোর নিরাপত্তা প্রধান।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি পুতিনের দাবির জবাব দেন।
জেলেনস্কি বলেন, “এই কদিন চীনে পুতিন গল্প বানিয়ে যাচ্ছে—যেন তিনি যুদ্ধের জন্য দায়ী নন। যেন কেউ তাকে বাধ্য করছে লড়তে, হত্যা করতে, শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্রে ঠেলে দিতে, আমাদের অবস্থানে আক্রমণের জন্য হাজারো মানুষ পাঠাতে। কিন্তু যে জিনিসে তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না, তা হলো শান্তি। রাশিয়া হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। অবশ্যই আমরা জবাব দেব।’’
তিনি আরও বলেন, রাশিয়াকে তার ‘অসীম দুঃসাহসের ফল’ ভোগ করতে হবে।
অন্যদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে অভিযোগ করেন, পুতিন, শি ও কিম যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করছেন। এ প্রসঙ্গে ক্রেমলিন জানিয়েছে, তারা আশা করে ট্রাম্প ‘মজা করে’ বলেছেন।
গত সপ্তাহে বিশেষ এক অনুষ্ঠানে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত উত্তর কোরীয় সেনাদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কিম। সেখানে তিনি বলেন, জীবিত অবস্থায় তাদের ফিরিয়ে আনতে না পারায় তিনি ‘বেদনায়’ ভুগছেন। নিহত সেনাদের স্মৃতিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং তাদের সন্তানদের দেখভালের প্রতিশ্রুতি দেন কিম। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/