তাহলে কী আফগানিস্তান পাকিস্তানের নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ভারতকে অনুসরণ করছে? আপাতদৃষ্টিতে তেমনটাই ঘটতে যাচ্ছে। বিদেশি সহায়তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজস্ব সম্পদেই কুনার নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করতে যাচ্ছে আফগানিস্তান। কুনার আফগানিস্তানের প্রধান পাঁচটি নদীর একটি। আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৪৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী আফগানিস্তানে পানি সম্পদের বড় অংশের জোগান দিয়ে থাকে।
খবরে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের পানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজাদা কুনার নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। দেশটির পানি ও বিদ্যুৎমন্ত্রী আব্দুল লতিফ মনসুর সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক পাক-আফগান সংঘাতের আবহে কাবুলের এই পদক্ষেপকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংবাদদাতারা বলছেন, পাকিস্তানের নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে চায় আফগানিস্তান। আর সে কারণেই আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের দিকে বয়ে যাওয়া কুনার নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করতে চায় দেশটির সরকার। দেশটির সর্বোচ্চ তালেবান নেতা হিবাতুল্লা আখুন্দজাদা ‘যত দ্রুত সম্ভব’ নদীতে বাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পাহেলগামে জঙ্গি হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধুর পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে দিয়েছিল ভারত। অনেকের দাবি, ভারতের পথে হেঁটেই এবার পাকিস্তানকে ‘পানিতে নাজেহাল’ করতে চাইছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার।
কুনার নদীর উৎপত্তি হয়েছে উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতে। নদীটি দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে পৌঁছেছে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে। পাকিস্তানের জালালাবাদ শহরে নদীটি কাবুল নদীর সঙ্গে মিশেছে। তারপর কাবুল নদী পাকিস্তানের অ্যাটক শহরের কাছে সিন্ধু নদের সঙ্গে মিশেছে। কুনার নদী পাকিস্তানে চিত্রল নদী নামেই পরিচিত।
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, কাবুল নদীতে পানির জোগান দিয়ে থাকে এই কুনার নদী। এই পানি কেবল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেই নয়, পাঞ্জাব প্রদেশেও কৃষি এবং অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। লন্ডনে কর্মরত আফগান সাংবাদিক সামি ইউসুফজাই এ প্রসঙ্গে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কাবুল এবং কুনার নদী পাকিস্তানে পানির অন্যতম উৎস।’
আফগানিস্তানের সহকারী তথ্যমন্ত্রী মুহাজের ফারাহি ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘তালেবান সরকারের শীর্ষ মহল থেকে বাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করতে বলা হয়েছে। এই কাজের জন্য বিদেশি সংস্থাগুলোর মুখাপেক্ষী না থেকে আফগান সংস্থাগুলোকে বরাদ্দ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।’
আফগান সাংবাদিক সামির ভাষ্য, ‘ভারতের পর আফগানিস্তানও পাকিস্তানে পানির জোগান নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।’ নয়াদিল্লির সঙ্গে তালেবান সরকারের সম্পর্ক যখন ক্রমেই জোরদার হচ্ছে, সেই সময় কাবুলের এই পদক্ষেপকে ইঙ্গিতপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আফগানিস্তান পানি সম্পদে বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু দশকের পর দশক যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আফগানিস্তান এই সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। কিন্তু পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষের পর কুনার নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি সামনে উঠে এসেছে। পানির হিস্যা নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্পর্শকাতর বিরোধ চলছে।
চলতি মাসের শুরুতেই সীমান্ত সংঘাতে জড়়িয়ে পড়ে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান। রাজধানী কাবুলে পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং তার পরবর্তী সময়ে তালেবান সরকারের জবাব সীমান্তকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে
যুদ্ধবিরতি চলছে। তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখনো তলানিতে।
এদিকে পাহেলগামে হামলার পর ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত রেখেছে ভারত। চুক্তি অনুযায়ী, বিপাশা, শতদ্রু, ইরাবতীর পানির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতের হাতে। অন্যদিকে সিন্ধু, বিতস্তা, চন্দ্রভাগার পানি ব্যবহার করতে পারবে পাকিস্তান। পানির নিরিখে সিন্ধু ও তার শাখা এবং উপ-নদীর ৩০ শতাংশ পানি ব্যবহার করতে পারবে ভারত। ৭০ শতাংশ পাবে পাকিস্তান। সিন্ধু, বিতস্তা, চন্দ্রভাগার পানি ভারত যে ব্যবহার করতে পারবে না, তা নয়। চুক্তিতে বলা হয়েছে, এই তিন নদীর পানি সেচের কাজের পাশাপাশি নৌ-চলাচল, মাছ চাষ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করতে পারবে ভারত। চুক্তি স্থগিতের পর পাকিস্তান নিয়ে ভারতকে হুমকি-ধমকিও দিয়েছে। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। চুক্তি পুনর্বহাল করেনি ভারত। এবার ভারতের পথে হেঁটে পাকিস্তানে নদীর পানিপ্রবাহ রুখে দিতে চাইছে আফগানিস্তান। তথ্য সূত্র: আফগানিস্তান ইন্টারন্যাশনাল।