ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী তরুণদের দেশ ত্যাগের নিয়মে শিথিলতা আনার পরই মাত্র দুই মাসের মধ্যে প্রায় এক লাখ ইউক্রেনীয় পুরুষ দেশ ছেড়েছেন। পোল্যান্ডের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর দেওয়া নতুন পরিসংখ্যানে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ইউক্রেন থেকে বের হওয়ার প্রধান পথ হলো পোল্যান্ড সীমান্ত। এই বিপুল সংখ্যক পুরুষের দেশত্যাগ ইউক্রেনের সামরিক জনশক্তির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
পোল্যান্ডের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, আগস্ট মাসের শেষের দিকে ইউক্রেন সরকার নিয়ম শিথিল করার পর থেকে ৯৯ হাজার ইউক্রেনীয় তরুণ (১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী) পোল্যান্ডের সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে সামরিক আইন জারি করে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সকল পুরুষকে দেশ ছাড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, এমনকি যারা সরাসরি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার যোগ্য ছিলেন না, তাদের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল।
টানা তিন বছর ধরে যুদ্ধ চলার পর, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নতুন একটি নিয়ম কার্যকর করেন, যার মাধ্যমে ইউক্রেনীয় পুরুষরা তাদের ২৩ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিদেশে ভ্রমণ করতে পারবেন। এটি ছিল ইউক্রেনের নিয়োগ নীতির পরিবর্তনের একটি অংশ। একই সময়ে, ফ্রন্টলাইনে সামরিক জনবলের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বয়সও ২৭ থেকে কমিয়ে ২৫ করা হয়।
জেলেনস্কি সরকার আশা করেছিলেন, কম বয়সী তরুণদের দেশ ছাড়ার স্বাধীনতা দিলে তারা পরে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে এসে যুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত হবে। এছাড়াও, আগস্ট মাসে জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন যে অনেক পরিবার তাদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ছেলেদের বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে না হয়। নতুন নিয়মের মাধ্যমে সেই প্রবণতাও কমবে বলে সরকার আশা করেছিল।
অন্যদিকে, আমেরিকান জেনারেল ও রাজনীতিবিদরা অভিযোগ করছিলেন যে, জেলেনস্কির পক্ষ থেকে সামরিক বয়সের পুরুষদের নিয়োগ না দেওয়া ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ সেনা নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। এই সময়ের মধ্যে রাশিয়া প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার সেনা হারাচ্ছে বা আহত হচ্ছে।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে ইউক্রেন সামরিক জনবলের ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যদিও ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের আশা ছিল যে এই নিয়মের পরিবর্তন স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা বাড়াবে, তবে বাস্তবে দেখা গেল বিপুল সংখ্যক তরুণ ইউরোপের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন।
পোল্যান্ডের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষের দিকে নিয়ম পরিবর্তনের আগে জানুয়ারি থেকে এই সময়ের মধ্যে ৪৫ হাজার ৩০০ জন ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় পুরুষ পোল্যান্ডে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু পরের দুই মাসেই সেই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৯৮ হাজার ৫০০-এ পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬০০ জন দেশ ছেড়েছে।
জার্মানিতেও এই প্রবণতা দেখা গেছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ, যিনি শিথিল অভিবাসন নিয়মে রাশ টানতে চাইছেন, তার দেশেও ইউক্রেনীয় তরুণদের আগমনের সংখ্যা বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় পুরুষের সাপ্তাহিক আগমন ১৯ জন থেকে বেড়ে ১ হাজার জনেরও বেশি হয়েছে। বাভারিয়ান সংবাদ সংস্থা বিআর২৪ জানিয়েছে, অক্টোবর নাগাদ তা বেড়ে প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০-তে দাঁড়িয়েছে।
জার্মানির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রকের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এই নতুন আগমন গ্রীষ্মে ইউক্রেনের নিয়মের পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অভিবাসনের ‘প্রথম ধাপ’। ইউক্রেনীয়দের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা জার্মান চ্যান্সেলর মের্জের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, কারণ চরম ডানপন্থী দল এএফডি ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য সহায়তা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে।
ডানপন্থী সিডিইউ দলের বৈদেশিক নীতি প্রধান জুর্গেন হার্ট বলেছেন, ‘‘তরুণ ইউক্রেনীয় পুরুষরা তাদের দেশের প্রতিরক্ষা না করে জার্মানিতে সময় কাটাক, সেটা আমরা চাই না।’’
তিনি মনে করেন, ইউক্রেনের আইন পরিবর্তনের ফলে যে দেশত্যাগের প্রবণতা দেখা দিয়েছে, জার্মানির উচিত দ্রুত সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া। সূত্র: দি টেলিগ্রাফ
মাহফুজ/