চীনের সঙ্গে একটি সহযোগিতা প্রকল্পের অধীনে নির্মিত এবং এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন (AIP) প্রযুক্তিতে সজ্জিত পাকিস্তানের হ্যাঙ্গর-শ্রেণীর সাবমেরিনের প্রথম ব্যাচটি ২০২৬ সালের মধ্যে পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে যোগদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রোপালশন (AIP) সিস্টেম দ্বারা চালিত সাবমেরিন একটি দীর্ঘ সময় একেবারে নীরবে ধরে ডুবে থাকতে পারে, যা এটিকে সনাক্ত করা আরও কঠিন করে তোলে।
পাকিস্তান নৌবাহিনীর নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এই কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে জানান। তিনি এটিকে চীন-পাকিস্তান নৌ সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
চীনের নকশায় তৈরি করা টাইপ ০৫৪এ/পি ফ্রিগেটগুলো পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহুমুখী মিশন পরিচালানার ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করবে, বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা, সাবমেরিন-বিরোধী যুদ্ধ এবং সামুদ্রিক নজরদারিতে।
পাকিস্তান নৌবাহিনী আশা করছে, চীনের নকশায় তৈরি করা সাবমেরিন আগামী বছরে সক্রিয় কার্যক্রমে যুক্ত হবে। দেশটির শীর্ষ অ্যাডমিরাল এ তথ্য জানিয়েছেন।
বলা যায়, এই পদক্ষেপের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব মোকাবিলায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জোরদারে বেইজিং আরও এগিয়ে যাবে।
গত রবিবার গ্লোবাল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের নৌ–প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে পাকিস্তান আটটি হাঙর ক্লাস সাবমেরিন পাবে চীনের কাছ থেকে। এ সময় তিনি জানান, এই বিষয়ে দেশটির সঙ্গে পাকিস্তানের চুক্তি ‘সফলভাবে এগোচ্ছে।’ তিনি বলেন, এসব সাবমেরিন পাকিস্তানের উত্তর আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে টহল সক্ষমতা বাড়াবে।
চীনা সাবমেরিন নিয়ে এই অগ্রগতির খবর এমন এক সময়ে এল, যার কয়েক আগেই পাকিস্তান বিমানবাহিনী মে মাসে চীনা তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতের ফরাসি তৈরি রাফাল বিমান ভূপাতিত করে। পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর এই আকাশযুদ্ধ সামরিক বিশ্লেষকদের বিস্মিত করেছে। এতে চীনা প্রযুক্তির বিপরীতে পশ্চিমা অস্ত্র প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের সাবমেরিন চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম চারটি ডিজেলচালিত অ্যাটাক সাবমেরিন তৈরি হবে চীনে। বাকি চারটি তৈরি হবে পাকিস্তানে, যাতে দেশটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তান এরই মধ্যে চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের একটি জাহাজঘাঁটি থেকে ইয়াংসি নদীতে তিনটি সাবমেরিন নামিয়েছে।
অ্যাডমিরাল আশরাফ গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, ‘চীনা উৎপাদিত প্ল্যাটফর্ম ও সরঞ্জাম নির্ভরযোগ্য, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর অপারেশনাল প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আধুনিক যুদ্ধের ধারা বদলাচ্ছে। এখন মানববিহীন ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাকিস্তান নৌবাহিনী এসব প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং চীনের সঙ্গে এ বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।’
চীনের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ইসলামাবাদ। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি গেছে পাকিস্তানে। অস্ত্র বিক্রির পাশাপাশি চীন পাকিস্তানে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে আরব সাগরে প্রবেশের নিজস্ব পথ গড়ে তুলতে। প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অর্থনৈতিক করিডর তৈরি করা হয়েছে, যা চীনের শিনজিয়াং অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর গোয়াদর পর্যন্ত বিস্তৃত।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের নেতৃত্বে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ এই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর। এর লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প পথ নিশ্চিত করা, যাতে মালাক্কা প্রণালি—যা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এবং যুদ্ধে সহজেই অবরুদ্ধ হতে পারে—এড়িয়ে চলা যায়।
এই উদ্যোগ চীনের প্রভাব বিস্তার করেছে আফগানিস্তান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার দিকে। একই সঙ্গে এটি কার্যত ভারতকে ঘিরে ফেলেছে—কারণ চীনের মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে।
বর্তমানে ভারত দেশীয়ভাবে তৈরি পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন পরিচালনা করছে।
এ ছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি ও রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি তিন শ্রেণির ডিজেলচালিত আক্রমণ সাবমেরিনও ভারতের হাতে রয়েছে।
সুলতানা দিনা/