পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বাড়াতে সংবিধান সংশোধনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দেশটির সরকার।
দেশটির সংবিধান সংশোধনের এই পরিকল্পনা সেনাপ্রধানের নিয়োগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড সংক্রান্ত সংবিধানের ২৪৩ ধারা পরিবর্তনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত। এই প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো ২৭তম সংশোধনীর অংশ।
বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ বিষয়ে এক প্রতিদেন প্রকাশ করে।
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে কথা বলার সময় এই খবরগুলো নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই, সরকার এটি আনছে এবং আনবে...২৭তম সংশোধনী আসবে... এবং আসতে চলেছে। আমরা চেষ্টা করব নীতি, আইন এবং সংবিধান অনুযায়ী এটি উত্থাপন করতে।’
এর আগে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে মে মাসে আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল করা হয়। পাকিস্তান এবং বিদেশে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে ইসলামাবাদ তার সংবিধান সংশোধনের পরিকল্পনা করছে, যা সম্ভবত সামরিক বাহিনীকে আরও ক্ষমতা দেবে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার নিশ্চিত করেছে যে, তারা শিগগিরই সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী সংসদে উত্থাপন করবে, যার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড সম্পর্কিত প্রস্তাবিত পরিবর্তন রয়েছে।
সমালোচকদের উদ্বেগ
দেশটির সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে, সংবিধান সংশোধনের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানে মুনিরের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকে আরও সুরক্ষিত করবে। সামরিক বাহিনীর সরাসরি শাসনের ইতিহাস, বেসামরিক সরকারের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে এর ভূমিকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন।
এর আগে পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির একটি টুইটের পর সংবিধানে এই পরিবর্তন নিয়ে জল্পনা শুরু হয় যে, সরকার ২৭তম সংশোধনীর জন্য তার কাছে সমর্থন চেয়েছে।
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সংবিধারেনর সংশোধনের বিষয়ে বিরোধীদল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI)-এর উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি আশ্বাস দেন, ‘এমন নয় যে সংশোধনী উত্থাপন করা হবে এবং এলোমেলোভাবে, অ্যাডহক পদ্ধতিতে তার ওপর ভোটাভুটি হবে; এমনটি হবে না।’
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কী?
পাকিস্তানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২৭তম সংশোধনীর অধীনে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের ২৪৩ ধারার পরিবর্তন, যা সেনাপ্রধানের নিয়োগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ড নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, প্রস্তাবটিতে সাংবিধানিক আদালত প্রতিষ্ঠা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া সরলীকরণ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পুনরুদ্ধার এবং বিচারকদের বদলির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এতে আরও প্রস্তাব করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সম্পদে প্রদেশগুলোর ভাগ কমানো হবে এবং শিক্ষা ও জনসংখ্যা কল্যাণ মন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণ প্রদেশগুলো থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে স্থানান্তর করা হবে, এবং জাতীয় অর্থ কমিশনের অধীনে প্রাদেশিক ভাগের সুরক্ষার অবসান ঘটানো হবে।
পদক্ষেপটির সমালোচনা
সাবেক সিনেটর মুস্তফা নওয়াজ খোখারের উদ্ধৃতি দিয়ে এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, এই সংশোধনী নতুন ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ পদ প্রবর্তনের চেষ্টা করছে, যা কার্যকরভাবে পাকিস্তানের বেসামরিক-সামরিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করবে।
খোখার বলেন, ‘এই পদক্ষেপ দেশের অবকাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেবে... আপনারা কি দেশটিকে অন্য কারও হাতে তুলে দিচ্ছেন? বেসামরিক আধিপত্যের ধারণার কী হলো? এই সংশোধনী বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এস্টাবলিশমেন্টের অধীনে নিয়ে আসবে, যা জাতির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেবে।’
শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং পিপিপি সিনেটর রাজা রব্বানিও বলেন, সংবিধান সংশোধনের পদক্ষেপটি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং ১৮তম সংশোধনীর ভালো কাজকে বাতিল করে দেবে।’
সংবিধান সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়া
সরকারকে এই সংশোধনী সিনেট এবং ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি উভয় ক্ষেত্রে পৃথকভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে পাস করতে হবে। ৩৩৬ সদস্যের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সরকারের প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্যের সমর্থন রয়েছে, যেখানে তাদের ২৩৩ জন সদস্যের সমর্থন আছে।
কিন্তু ৯৬ সদস্যের সিনেটে তাদের মাত্র ৬১ জন সদস্য রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে তাদের কমপক্ষে তিনজন বিরোধী সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। সরকার মাওলানা ফজলুর রেহমানের নেতৃত্বাধীন জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলাম ফজল-এর সমর্থন পেতে পারে।
তবে, পিটিআই নেতা হামিদ খান জানান, তার দল এই সংশোধনীর বিরোধিতা করবে এবং সংবিধানকে ধ্বংস করার সরকারি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করবে।
ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনিরের উত্থান
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান আসিম মুনিরকে ভারতের অপারেশন সিঁন্দুরের পরে মে মাসে ফিল্ড মার্শাল করা হয়। তখন থেকে তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ময়দানে তার নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার জন্য কাজ শুরু করন। তিনি বেশ কয়েকটি বৈশ্বিক প্রতিনিধি দলের অংশ হয়েছেন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আলোচনার সময় তার ভূমিকার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা পেয়েছেন। সূত্র; এনডিটিভি
সুমন/