দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা কৃষকদের প্রতি আচরণের অভিযোগ তুলে দেশটিতে অনুষ্ঠেয় এ বছরের জি-২০ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল শুক্রবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন, “জি-২০ সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজন করা সম্পূর্ণ লজ্জাজনক একটি বিষয়।”
তিনি বলেন, “আফ্রিকানাররা (যারা ডাচ, ফরাসি ও জার্মান বংশোদ্ভূত) হত্যা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন, তাদের জমি ও খামার জোরপূর্বক দখল করা হচ্ছে।” ট্রাম্পের এই দাবিগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষ বারবার অস্বীকার করেছে।
ট্রাম্প আরও লেখেন, “যতদিন এসব মানবাধিকার লঙ্ঘন চলবে, ততদিন কোনো মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সম্মেলনে অংশ নেবেন না। আমি ২০২৬ সালের জি-২০ সম্মেলন মায়ামি, ফ্লোরিডায় আয়োজনের অপেক্ষায় আছি।”
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুনরায় হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে ট্রাম্প বহুবার দাবি করেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গদের হাতে সাদা সংখ্যালঘুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। তবে দেশটির সরকার এবং শীর্ষ আফ্রিকানার নেতারা এই অভিযোগ নাকচ করেছেন।
আগেও, গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি নিজে জোহানেসবার্গে আসন্ন ২২–২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য জি২০ সম্মেলনে যোগ দেবেন না এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে জি-২০ থেকে বহিষ্কারের আহ্বান জানান।
আগে ধারণা করা হয়েছিল, ট্রাম্পের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্মেলনে যোগ দেবেন। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সূত্র জানিয়েছে, তিনিও আর দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছেন না।
দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত জানুয়ারিতে, যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ভূমি মালিকানায় বৈষম্য দূর করতে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করেন। বর্ণবৈষম্য শেষ হওয়ার তিন দশক পরও দেশটির বেসরকারি জমির তিন-চতুর্থাংশ এখনো সাদা সংখ্যালঘুদের দখলে।
নতুন এই আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্র এখন বিশেষ পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। রামাফোসা দাবি করেছেন, এটি কোনো জবরদখল নয়; বরং ন্যায্য পুনর্বণ্টনের একটি কাঠামো তৈরি করবে, বিশেষ করে যেখানে জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।
এই আইন কার্যকর হওয়ার পরপরই ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকাকে “জমি বাজেয়াপ্ত করা এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে খুব খারাপভাবে আচরণ করার” অভিযোগে অভিযুক্ত করেন এবং বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এটা মেনে নেবে না, আমরা পদক্ষেপ নেব।”
চলতি বছরের মে মাসে ট্রাম্প প্রশাসন দক্ষিণ আফ্রিকার ৫৯ জন শ্বেতাঙ্গ নাগরিককে আশ্রয় দেয়, যা “বর্ণ বৈষম্যের শিকারদের মানবিক পুনর্বাসন” কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সেই মাসেই হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট রামাফোসার সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প সরাসরি অভিযোগ তোলেন যে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানারদের ওপর “গণহত্যা” চলছে।
রামাফোসা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “যদি সত্যিই এমন কোনো গণহত্যা চলত, তাহলে আমার পাশে বসা এই তিনজন মানুষ—গলফার আর্নি এলস, রেটিফ গুসেন এবং ব্যবসায়ী জোহান রুপার্ট—আজ এখানে থাকতেন না।”
দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসবিদ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সল ডুবো আগে সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্পের তথাকথিত ‘শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা’ দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।” তিনি ধারণা দেন, দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে তোলায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন।
তবুও, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। গত ৩০ অক্টোবর হোয়াইট হাউস ঘোষণা দেয়, নতুন আশ্রয়প্রাপ্তদের অধিকাংশই হবেন দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ নাগরিক।
বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রবেশের অনুমোদিত সংখ্যা মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকানার জনগণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ ১৪২০৪ অনুসারে, এবং অন্যান্য দেশে অবৈধ বা অন্যায় বৈষম্যের শিকারদের জন্যও সীমিত সংখ্যক স্থান নির্ধারিত থাকবে।” সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/