যুক্তরাজ্যের রাস্তায় রাশিয়ার রাসায়নিক হামলার শিকার হওয়ার বিভীষিকার কথা নিয়ে প্রথমবারের কথা বললেন সাবেক এক রুশ গুপ্তচর ও তার মেয়ে। ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালের ৪ মার্চ সালিসবুরিতে।
এদিন এমআই৬-কে (যুক্তরাজ্যের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) তথ্য সরবরাহকারী রাশিয়ার ডাবল এজেন্ট সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার ৩৩ বছর বয়সি মেয়ে ইউলিয়া স্ক্রিপাল রুশ এজেন্টদের রাসায়নিক অস্ত্রের বিষে প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিলেন। তিনি আরো দাবি করেন, এই হামলা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে হয়েছিল।
ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্ক্রিপালদের বাড়ির দরজার হাতলে মারাত্মক নভিচক নার্ভ এজেন্ট (রাসায়নিক অস্ত্র) ছড়ানো হয়েছিল। বিষক্রিয়ার পর তারা তিন সপ্তাহ কোমায় চলে যান। দীর্ঘ সময় কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়ে অবশেষে তারা বেঁচে ফেরেন। এরপর থেকে তারা গোপনে বসবাস করছেন। এখন ঘটনার ওপর হওয়া সরকারি তদন্তে দেয়া তাদের লিখিত বিবৃতিতে সেই ভয়াল দিনের সবকিছু উঠে এসেছে।
প্রসঙ্গত, নোভিচক "নবাগত" শ্রেণীর স্নায়ু এজেন্ট হল কম বৈশিষ্ট্যযুক্ত এক ধরনের অর্গানোফসফেট এজেন্ট বা রাসায়নিক অস্ত্র। নোভিচক এজেন্টগুলোকে VX গ্যাসের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলে মনে করা হয়। এগুলোকে একক এবং বাইনারি আকারে প্রয়োগ করা যায়। অক্সিম এবং অ্যাট্রোপিন হল এটির সবচেয়ে কার্যকরী প্রতিষেধক।
১৯৯৭ সালের রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের অধীনে যুদ্ধে পরিচিত নোভিচক এজেন্টের ব্যবহার নিষিদ্ধ। অন্যান্য স্নায়ু এজেন্টের মতো, নোভিচক এজেন্টগুলি অপরিবর্তনীয়ভাবে অ্যাসিটাইলকোলিনস্টেরেজকে আবদ্ধ করে এবং একটি কোলিনার্জিক টক্সিড্রোম তৈরি করে।
তীব্র, উচ্চ-মাত্রার স্নায়ু এজেন্ট প্রায়োগের ফলে তীব্র শ্বাসকষ্ট , চেতনানাশ, খিচুনি, পক্ষাঘাত এবং কোমাসহ নায়ুতন্ত্রের স্থবিরতার কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে।
ইউলিয়া জানান, রাশিয়া থেকে আগের দিন যুক্তরাজ্যে পৌঁছে পরদিন বাবা-মেয়ে লাঞ্চ খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দু’জনের চোখ কাঁপতে শুরু করে, যা তারা প্রথমে ‘মজার’ বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু এর পরপরই শ্বাসকষ্ট, প্রবল বিভ্রম, দৃষ্টিবিভ্রাট এবং বমি শুরু হয়। রেস্তোরাঁ ছাড়ার পর তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে।
ইউলিয়া বলেন, ‘রাস্তার সবকিছু দুলছিল খুবই খারাপভাবে। আমাকে বাবার হাত ধরে থাকতে হয়েছিল। কিছুদূর গিয়ে সাইন্সবারির কার পার্কের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারা আর এগোতে না পেরে একটি বেঞ্চে বসে পড়েন।’ তিনি আরও বলেন, বসে সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত, ভয়ানক অনুভূতি হলো। চারদিকে সব ঝাঁপসা, রঙ বদলে গোলাপি, লাল, নীল হয়ে যাচ্ছে, যেন এলএসডি বা অ্যামফেটামিন নিয়েছি।’
এর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পথচারীরা তাদের সাহায্য না করলে নিজের বমিতেই শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল বলে তিনি মনে করেন।
এদিনের একটি সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, তিনি বাবার কাঁধে হেলে আছেন এবং শুধু বাম হাত দিয়ে গোল গোল ঘূর্ণি আঁকার মতো নড়াচড়া করছেন।
সের্গেই স্ক্রিপাল তার নথিতে বলেন, আমি বিভ্রমে আরবি পুরুষ-নারী দেখছিলাম। তাদের একজনকে ঘুষিও মারি। জানতাম এগুলো বিভ্রম, কারণ সালিসবুরিতে তো আরবি মানুষ খুব বেশি থাকে না।
তিন সপ্তাহ কোমায় থাকার পর জেগে উঠে তিনি ভাবেন কেবল একদিন গেছে। কিন্তু আসলে কেটে গেছে ২১ দিন। ঘটনার পর কাউন্টার টেরর পুলিশ ও ১৮০ জন রাসায়নিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়ে বিশাল তদন্ত চালায়।
তদন্তটির নাম ডন স্টার্জেস ইনকোয়ারি। ডন স্টার্জেস ৪৪ বছর বয়সী এক নারী। তিনি পরিত্যক্ত সুগন্ধির বোতলে থাকা নভিচক ভুল করে শরীরে স্প্রে করে মারা যান। পরীক্ষায় প্রমাণ মেলে, এটি সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৮০-এর দশকে তৈরি করা সামরিক পর্যায়ের নার্ভ এজেন্ট (রাসায়নিক অস্ত্র)।
ব্রিটিশ পুলিশ বিশ্বাস করে, দুই রুশ গুপ্তচর ভুয়া নাম আলেকজান্ডার পেত্রভ ও রুসলান বশিরভ ঘটনার আগের দিন যুক্তরাজ্যে যান এবং স্ক্রিপালের বাড়িতে বিষ প্রয়োগ করেন। পরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রকৃত পরিচয় বের করে।
তাতে দেখা যায় তারা আসলে ইভান এরমাকভ ও আলেক্সেই লুগোভ। দাবি করেন, তারা নাকি সালিসবুরির ‘খ্যাতিমান ১২৩ মিটার উঁচু ক্যাথেড্রালের চূড়া দেখতে’ গিয়েছিলেন। তা নিয়ে ব্যাপক উপহাস হয়।
ব্রিটিশ সরকার আরও অভিযোগ করে, ২০১৩ সাল থেকে তারা ইউলিয়ার ইমেইল হ্যাক করছিল এক্স-এজেন্ট ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে। এছাড়া ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে তারা এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছে। আগামী মাসে এই তদন্তের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে।
সুলতানা দিনা/