হরমুজ প্রণালীর দিকে পাঠানো চারটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শুক্রবার (৫ জুন) এর জবাবে ইরানের কয়েকটি উপকূলীয় নজরদারি রাডার কেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর নীতির মধ্যে এ ঘটনা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, ‘আক্রমণকারী ড্রোনগুলো আঞ্চলিক সামুদ্রিক চলাচলের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করেছিল।’
বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বন্দর কার্যক্রমের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর ফলে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
সেন্টকম জানায়, ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রণালীর একটি দ্বীপসহ একাধিক রাডার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
এই ঘটনা সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার সবশেষ অধ্যায়, যা যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব এবং তা সম্প্রসারণের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সপ্তাহের শুরুতে একটি ইরানি ড্রোন কুয়েতের প্রধান বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনালে আঘাত হানলে একজন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। ঘটনার পর বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
যদিও এসব হামলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে, তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে পরিস্থিতি মোটামুটি ভালোভাবেই এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
উইসকনসিনে কৃষকদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই ইরান ইস্যুর সমাধানে পৌঁছাব। সেটা আলোচনার মাধ্যমে হোক বা কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে- যেভাবেই হোক আমরা সফল হব।’
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্প এমন একটি সংঘাতের মধ্যে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছেন, যা বর্তমানে অচলাবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে মার্কিন ও ইরানি আলোচকরা ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত শর্ত এবং ইরানের নীরব অবস্থান অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি তাদের জন্য খুবই কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। তারা স্বাধীন, শক্তিশালী এবং গর্বিত জাতি। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কিছু সিদ্ধান্ত তাদের নিতেই হবে।’
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের কাছে এখনও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে।
এদিকে, ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের মধ্যে যে নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে, তা নিয়েও মার্কিন প্রশাসন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। তবে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ওই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
শুক্রবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় এবং ৯টি গ্রামের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ৯জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষের সময় তাদের দুই সৈন্য আহত হয়েছেন, যার মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননের চলমান সংঘাত ইরান-সংক্রান্ত সংকট নিরসন এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালুর প্রচেষ্টাকেও প্রভাবিত করতে পারে। কারণ ইরান দাবি করে আসছে, যেকোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় লেবাননের পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালীতে ড্রোন প্রতিহত করার পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ভারত মহাসাগরে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেলবাহী ট্যাংকারে অভিযান চালিয়েছে। এর লক্ষ্য ইরানের তেল রপ্তানি থেকে আয় সীমিত করা।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও তেলবাহী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সূত্র: এনডিটিভি
অমিয়/