সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকায় মুসলিম ব্রাদারহুডের কিছু চ্যাপটার বা শাখাকে নিষিদ্ধ করেছেন।
ট্রাম্পের এ সংশ্লিষ্ট আদেশে বলা হয়, মুসলিম ব্রাদারহুডের কিছু অধ্যায় বা অন্যান্য উপবিভাগকে INA এর ধারা 219 (8 USC 1189) এবং বিশেষভাবে মনোনীত বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করা হবে। যা IEEPA (50 USC 1702) এবং ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০১ এর নির্বাহী আদেশ 13224 (সন্ত্রাসবাদে জড়িত, হুমকি প্রদানকারী বা সমর্থনকারী ব্যক্তিদের সাথে সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা এবং লেনদেন নিষিদ্ধ করা) অনুসারে সংশোধিত।
নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে বলা হয়, ১৯২৮ সালে মিশরে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদারহুড, মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও শাখাগুলোর একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সেখানে প্রাসঙ্গিকভাবে, লেবানন, জর্ডান এবং মিশরে এর শাখাগুলো তাদের নিজস্ব অঞ্চল, মার্কিন নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ক্ষতি করে এমন সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতা প্রচারণায় জড়িত বা সহায়তা করে এবং সমর্থন করে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর,ইসরায়েলে হামলার পর, মুসলিম ব্রাদারহুডের লেবানন শাখার সামরিক শাখা হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বেসামরিক এবং সামরিক উভয় লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে একাধিক রকেট হামলা চালায়।
এছাড়া, মুসলিম ব্রাদারহুডের মিশরীয় শাখার একজন সিনিয়র নেতা, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার এবং স্বার্থের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমণের আহ্বান জানান এবং জর্ডানের মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে হামাসের জঙ্গি শাখাকে বস্তুগত সহায়তা প্রদান করে আসছেন।
এ ধরনের কার্যকলাপ লেভান্ট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশে আমেরিকান বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি আমাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
অন্যদিকে,মুসলিম ব্রাদারহুড আরব বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামপন্থী আন্দোলনগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিত। প্যান-ইসলামবাদী সংগঠনটি ১৯২৮ সালে মিশরে ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী ধারণার বিস্তার রোধ করার জন্য একটি ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর এটি দ্রুত মুসলিম দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রেক্ষাপতে এটি একটি প্রধান নেপথ্যের খেলোয়াড় হয়ে ওঠে আর প্রায়শই গোপনে তাদের কাজ করতে থাকে।
ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা, মিশরীয় স্কুলশিক্ষক হাসান আল-বান্না বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে ইসলামী নীতি পুনরুজ্জীবিত করলে মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা উপনিবেশবাদকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।
আরেকদিকে, মুসলিম ব্রাদারহুড মিশর এবং সৌদি আরবে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে নিষিদ্ধ। জর্ডান ২০২৫ সালের এপ্রিলে এটিকে নিষিদ্ধ করে। তবে তারপরও এটি জর্ডানে বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় এবং ২০২০ সালে দেশটির শীর্ষ আদালত এই গোষ্ঠীটিকে বিলুপ্ত করার রায় দেওয়ার পরেও সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বলে রাখা ভালো, যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে আছে সুদানকেন্দ্রিক চিন্তাধারা এবং সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধে সুদানের গৃহযুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা।
ট্রাম্প এর আগে একবার সুদান সম্পর্কে এক অদ্ভুত বাক্যে বলেন, ‘পৃথিবীতে সুদান নামে একটা জায়গা আছে। সুদান, সন্ত্রাসবাদ আর আমেরিকার ইতিহাস একে অন্যকে ছুঁয়ে আছে নানাভাবেই।’ ট্রাম্পের একথা থেকেই সুদান, ব্রাদারহুড আর এই নিষেধাজ্ঞাকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র আজও মনে করে, সুদান নব্বইয়ের দশকে ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেয় এবং সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন তখন বিন লাদেনকে গ্রেপ্তার বা আঘাত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়, এর পরপরই তিনি আফগানিস্তানে চলে যান। পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার অনুসারীরা টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলা চালায়। এতে তিন হাজার নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়। পরবর্তী সময়ে এই হামলার জের ধরে ওয়ার অন টেরর বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মূল্য চুকাতে প্রাণ দিতে হয় প্রায় ১০ লাখ মানুষকে।
মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করা এবং সুদানের যুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে মূলত ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিরাপদ করতে চাইছেন। তিনি সন্ত্রাসবাদের মূল শিকড়েই হাত দিতে যাচ্ছেন।
পক্ষান্তরে,আজকের সুদান আবারও পশ্চিমাবিরোধী শক্তিকে আশ্রয় দিচ্ছে। সুদানের তিনটি বড় ঝুঁকি—অ্যালাইনমেন্ট, অ্যানিহিলেশন, অ্যালায়েন্স। যার অর্থ দাঁড়ায়-ট্রাম্প যুদ্ধ থামাতে পারবেন, আমেরিকাকে নিরাপদ করতে পারবেন, আর আরব ও ইসরায়েলি মিত্রদের জন্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে পারবেন।
প্রসঙ্গত, প্রায় পাঁচ কোটি জনসংখ্যার দেশ সুদানের সাতটি দেশের সঙ্গে সীমানা রয়েছে। এর মধ্যে মিসরের সঙ্গে সুদানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। মিসর থেকেই সুদানে পঞ্চাশের দশকে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। যে মতাদর্শ মূলত স্থায়ী ধর্মকেন্দ্রিক যুদ্ধ, ইসরায়েল ধ্বংস এবং রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনৈতিক শাসন বাস্তবায়ন করতে চায়।
এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৮৯ সালে ইসলামি মতাদর্শের সেনা কর্মকর্তা ওমর আল-বশির অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সুদানে ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। বশির দেশকে আমেরিকাবিরোধী এক পথে নিয়ে যান। বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়া ছিল সেই মনোভাবেরই অংশ।
বশির ও ব্রাদারহুডের আদর্শবাদীরা নারীদের ওপর কঠোর শরিয়াভিত্তিক আইন চাপিয়ে দেন, যেখানে শাস্তির মধ্যে হাত কেটে দেওয়া বা পাথর ছুড়ে হত্যার মতো বর্বর পদ্ধতিও ছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বশিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার পাঁচটি অভিযোগ গঠন করেছে। এই আমেরিকাবিরোধী সরকারকে দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তার ফলও মেলে।
২০১৯ সালে বশিরবিরোধী গণ-আন্দোলনের পর আবদাল্লা হামদকের নেতৃত্বে নতুন বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুদানের সম্পর্ক ঠিক করা এবং বশিরযুগের গভীর রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রভাব শেষ করতে হামদক তিনটি পদক্ষেপ নেন—পুরোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারাগারে পাঠানো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য আমেরিকাপন্থী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা।
হামদক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ ছিল—বশিরযুগের ইসরায়েলবিরোধী, আমেরিকাবিরোধী আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প-উদ্যোগে চালু হওয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যোগ দেওয়া। মরক্কো, বাহরাইন ও ইউএই–এর সঙ্গে সুদান ছিল চুক্তির চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যারা ইসরায়েলকে ঘিরে আঞ্চলিক বাস্তবতাকে বদলে দেয়।
কিন্তু পুরোনো ইসলামি ঘাঁটি আবার পাল্টা আঘাত হানে। ২০২১ সালে হামদকের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং তিনি নির্বাসিত হন। সুদান আব্রাহাম অ্যাকর্ড বাস্তবায়ন স্থগিত করে, আর বিন লাদেন-ধারার পুরোনো মতাদর্শ আবার মাথা তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অ্যালাইনমেন্ট ছিল সামরিক বাহিনীর ভেতরে ব্রাদারহুডের শক্ত ঘাঁটির অপছন্দের। অ্যানিহিলেশন, অর্থাৎ সম্পূর্ণ ধ্বংসের সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়।
২০২১ সালের এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। তিনি নিজেকে সুদানের একক নেতা বলে দাবি করেছিলেন, কিন্তু অনেকেই তাকে বশিরের নেটওয়ার্কের খুব কাছের মানুষ হিসেবে দেখতেন।
এর মধ্যে এই বৈধতা-সংকটের সময় মোহাম্মদ দাগালো, যিনি ‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত, সুদানি সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ)গঠন করেন। এই দুই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আছে। তারা দুজনই অসংখ্য নাগরিক হত্যার দায় বহন করছেন এবং উভয়ই অপর পক্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলেরও সংশ্লিষ্টতা আছে। কেননা সুদানের সঙ্গে ইসরায়েলে ৭ অক্টোবরের হামাস হামলার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই বাইডেন প্রশাসন সুদানি ব্যবসায়ী আবদেলবাসিত হামজাকে স্পেশালি ডিজাইনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট ঘোষণা করে। কারণ তিনি হামাসের সামরিক কাঠামোর আর্থিক জোগানদাতা ছিলেন।
বিস্ময়করভাবে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর বুরহান তাকে কেবল মুক্তই করেননি বরং পুনর্বাসিতও করেন। তিনি প্রকাশ্যে হামাসের সামরিক শাখা ক্বাসাম ব্রিগেডকে সমর্থন করেন। আর এই ইউনিটই ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায়।
আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন খলিল আল–হাইয়া, যিনি এখন হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং যিনি দোহায় ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু। তিনি ৭ অক্টোবর হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ছাত্র এবং উত্তরসূরি।
নব্বইয়ের দশকে হাইয়া খার্তুমে পড়াশোনা করেন এবং তখনই আরও ‘উগ্র’ হয়ে ওঠেন। সে সময় সুদান ছিল অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামি কেন্দ্রগুলোর একটি। সুদানে কাটানো সময় তাকে সেই পুরোনো নেটওয়ার্কের ভেতরের প্রবেশাধিকার দেয়, যা ব্রাদারহুড, বিন লাদেন, হামাস ও সন্ত্রাসী অর্থায়নকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। তাছাড়া, হামাস নেতা খালেদ মেশালও সুদানি পাসপোর্ট পেয়েছিলেন।
ইরানের লজিস্টিক ও কূটনৈতিক চ্যানেল এসএএফ–কে সমর্থন দিয়েছে এবং ইয়েমেন থেকে হুতি যোদ্ধাদের সুদানে নিয়ে এসেছে। হুতিরা আমেরিকান জাহাজে হামলা চালিয়েছে, ইসরায়েল ও আমেরিকা ধ্বংসের শপথ নিয়েছে। আর এখন তারা লোহিত সাগরের আরও ওপরের দিকের রুটেও সক্রিয়। এখান দিয়ে বিশ্বের ১৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তাই সুদানের এই অস্থিরতা ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নতুন উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাসের হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না, কিন্তু ছন্দ মিলিয়ে ফিরে আসে। তিরিশ বছর পর সুদান আবারও সেই প্রাক-৯ / ১১ পরিবেশের ছায়া দেখাচ্ছে। সেখানে হামাস, হুতি এবং তাদের অর্থদাতারা আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা পায়। সেক্ষেত্রে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে হয়ত ক্লিনটন-যুগের ভুল এড়িয়ে চলতে চাইছেন।
একারনেই যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, সুদান অবিলম্বে বেসামরিক শাসনে ফিরে আসুক, আবদেলবাসিত হামজাকে হস্তান্তর করুক, মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করুক এবং অন্য সন্ত্রাসী অর্থদাতাদের হয় দেশ থেকে বহিষ্কার, নয়তো আবার কারাগারে ফেরত পাঠাক।
সুলতানা দিনা/