আজ ৮ ডিসেম্বর। গত বছরের এই দিনে পতন ঘটে সিরিয়ার দীর্ঘ দুই যুগের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের শাসনের। তার পতনের বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে সিরিয়া। রাজধানী দামেস্কসহ সারা দেশে বইছে আনন্দের বন্যা। আসাদ শাসনের অবসান এবং সিরিয়ার মুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে গত দুদিন ধরে রাজধানী দামেস্কের উমাইয়া স্কয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে বড় জমায়েত করেছে সিরিয়ানরা।
বহু বছর ধরে কঠোর পুলিশি রাষ্ট্র এবং নির্যাতন ও গুমের জন্য কুখ্যাত আসাদ সরকারের পতন সিরিয়ার বহু মানুষের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো এক স্বস্তি এনে দিয়েছে। ১৯৭০ সালে বাশারের পিতা হাফেজ আল আসাদ ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম দশকগুলোর মধ্যে এমন স্বস্তির অভিজ্ঞতা হলো জনগণের।
দশ বছর নির্বাসনে থাকার পর সৌদি আরব ও মিসর থেকে মাত্র এক সপ্তাহ আগে দামেস্কে ফিরে এসেছেন ২৪ বছর বয়সী আবু তাজ। তার কাছে দেশের এই পরিবর্তন অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, দেশের সংস্কৃতি এখন জনগণের জন্য।
দামেস্কের প্রধান মিলনস্থল উমাইয়া স্কয়ারের বাইরে, উমাইয়া মসজিদের কাছে এবং মারজেহ স্কয়ারে এখন সবুজ, সাদা এবং কালো পতাকা চোখে পড়ার মতো। দেইর এজ জোর থেকে আসা ২২ বছর বয়সী ওমরান নয় বছর পর তার মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন । তিনি বলেন, আমরা সবাই খুব খুশি আল্লাহর রহমতে।
আসাদ শাসনের পতনের পর প্রথমদিকে ইরাক বা লিবিয়ার উদাহরণের মতো ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, এক বছর পর সেই পরিস্থিতিতে উন্নতি এসেছে। দেশটির আইনজীবী রাহেমা আল-তাহা বলেন, প্রথমদিকে নিরাপত্তা কম থাকলেও গত এক বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, সবকিছুই ভালো হচ্ছে এবং প্রতি মাসে আমরা নতুন কিছু দেখছি।
অবকাঠামো ও পরিষেবায় দ্রুত উন্নতি
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে এবং মৌলিক পরিষেবাগুলো প্রদানে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। বেতন ও কর্মঘণ্টায় সংকট দূর করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ২ লাখ ৫০ হাজার সিরিয়ান পাউন্ড (প্রায় ১৫ ডলার) থেকে বাড়িয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার সিরিয়ান পাউন্ডে (৬৫ ডলার) উন্নীত করা হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিষেবায়ও নজর দেওয়া হয়েছে। দামেস্ক, আলেপ্পো, হোমস এর মতো বড় শহরগুলোতে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবারাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
দামেস্কের বাসিন্দা ক্রিস তুমের মতে, আসাদ সরকারের অধীনে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন কার্যত অচল ছিল। তিনি বলেন, এখন আমরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ি খুঁজে পাই। গ্যাসোলিন এবং ডিজেলের সহজলভ্যতার কারণে জীবন স্বাভাবিক হয়েছে। সিরিয়া আরও ভালো জায়গায় যাওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার উপলব্ধি ও নিরাপত্তার আশ্বাস
আসাদ সরকারের অধীনে সিরিয়ার জনগণের ওপর যে অন্ধকার ছায়া ফেলেছিল, সেই কুখ্যাত কারাগারগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
১৪ বছর পর সিরিয়ায় ফেরা জেইন আল-আবিদিন দিয়ে বলেন, অতীতে মতামত প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল। আজ আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে আমাদের কণ্ঠস্বর শোনাতে পারি। তিনি আরও যোগ করেন, ১৪ বছর পর দেশে ফিরতে পারাটাই এক বিপ্লব।
দামেস্কের আরেক বাসিন্দা মরিয়ম আল-খালিদ জানান, নিরাপত্তার পরিবেশ অতীতের তুলনায় তুলনাহীনভাবে উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, গতকাল একটি ইনকিউবেটরের প্রয়োজন ছিল এমন একটি শিশুকে সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করা হয়েছিল। আসাদ আমলে কোনো সুপারিশ ছাড়া এটা অসম্ভব ছিল। তিনি আরও বলেন, দেশটি সত্যিই সুস্থ হয়ে উঠছে।
২০১২ সালের পর দামেস্ক ভ্রমণ করা খালিদ আল-খাতিব বলেন, আসাদ শাসনের সময় নিরাপত্তা নিয়ে যে নিপীড়ন ছিল, তাতে মনে হতো যেন জেলে আছি। শহর ছেড়ে যাওয়া ছিল একটি স্বপ্ন। আজ সর্বত্র বিশ্বাস, সম্মান, মর্যাদা রয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ডলারের দর ১৭ হাজার সিরিয়ান পাউন্ড থেকে কমে ১২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সবকিছুই ভালো হচ্ছে। সিরিয়া সেরাটা পাওয়ার যোগ্য।
যদিও মার্চে সিরিয়ার উপকূল বরাবর এবং জুলাই মাসে সুয়াইদায় কিছু সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখা গিয়েছিল, যেখানে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, তবে সরকার পরিস্থিতি শান্ত করতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করেছিল। সিরিয়ার জনগণ এখন আশাবাদী যে তাদের দেশ একটি মুক্ত, নিরাপদ জাতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি জনগণ নিজেই। সূত্র: আল-জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি
মাহফুজ/