ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তবে, দেশটির বিরুদ্ধে খুবই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বুধাবার (১৪ জানুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইরানে সহিংস দমন-পীড়নে এ পর্যন্ত ২,৪০০-এর বেশি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
গত সপ্তাহে ইরানে আটক হওয়া ২৬ বছর বয়সী এরফান সুলতানির আত্মীয়রা বিবিসি পার্সিয়ানকে জানিয়েছেন যে, বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কথা ছিল। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও-এর একজন প্রতিনিধি বিবিসিকে বলেছেন যে, তারা কখনো কোনো মামলা এত দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগোতে দেখেননি।
বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিক্ষোভকারীদের সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি তাদের ফাঁসিতে ঝোলায়, তবে আপনারা অনেক কিছু দেখতে পাবেন... তারা এমন কিছু করলে আমরা অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নেব।’
সুলতানির এক আত্মীয় বিবিসি পার্সিয়ানকে জানান, ইরানের একটি আদালত মাত্র দুই দিনের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুত প্রক্রিয়ায় এই মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আশঙ্কা করছেন যে, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সুলতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে।
হেনগাও-এর প্রতিনিধি আউইয়ার শেখি বুধবার বিবিসির ‘রেডিও ৪ টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘সুলতানিকে আটক করার মাধ্যমে ইরানি সরকার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার এবং আর কোনো বিক্ষোভ হতে না দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
শেখি আরও জানান, সুলতানির বোন- যিনি নিজে একজন আইনজীবী- এই মামলায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছে যে এ বিষয়ে আর কিছু করার নেই।
ইরানে সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের শেষ মুহূর্তে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়। শেখি জানান, ইরানি কর্তৃপক্ষ পরিবারকে এরফানের মৃত্যুদণ্ডের আগে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও, গ্রেপ্তারের পর থেকে তাকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।
ইরানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে, তবে এর জন্য তিনি সন্ত্রাসীদের দায়ী করেছেন।
এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, তিনি মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসে একটি বৈঠকে অংশ নিয়ে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন এবং বিক্ষোভের প্রকৃত নিহতের সংখ্যা জানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, নিহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না। তিনি জানান যে, সংখ্যাটি পাওয়ার পর আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও তারা এ পর্যন্ত ১২ জন শিশুসহ ২,৪০৩ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটি আরও জানায় যে, সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫০ জন ব্যক্তিও নিহত হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, বুধবার তেহরানে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০০-এর বেশি সদস্য এবং তাদের ভাষায় আরও কিছু শহিদদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাম্প তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে বড় মূল্য দিতে হবে এবং তিনি জনগণকে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আরও যোগ করেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব বৈঠক বাতিল করেছি।
বিক্ষোভ দমনের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সামরিক ও অন্যান্য বিকল্প নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছেন। ইতোমধ্যে তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা যেকোনো দেশের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
ইরান সরকার এর জবাবে অভিযোগ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরির চেষ্টা করছে এবং সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই কৌশল আগেও ব্যর্থ হয়েছে।
মুদ্রার মান কমে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকে ইরানের ৩১টি প্রদেশের ১৮০টি শহর ও জনপদে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। দ্রুতই এটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয় এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই এখন ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার থেকে বিক্ষোভ ব্যাপক আকার ধারণ করলে কর্তৃপক্ষ মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে এবং ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এইচআরএএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই অস্থিরতায় এ পর্যন্ত ১৮,৪৩৪ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতো বিবিসিরও ইরানের ভেতর থেকে রিপোর্ট করার সুযোগ নেই, তাই রক্তক্ষয়ের প্রকৃত মাত্রা পরিমাপ করা কঠিন।
তবে রবিবার অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারে মানুষ তাদের প্রিয়জনদের মৃতদেহ খুঁজছে। বিবিসি ওই ফুটেজে অন্তত ১৮০টি চাদরে মোড়ানো মৃতদেহ এবং বডি ব্যাগ গণনা করেছে। সোমবার প্রকাশিত অন্য একটি ভিডিওতে সেই একই কেন্দ্রে আরও প্রায় ৫০টি মৃতদেহ দেখা গেছে।
সোমবার একজন অ্যাক্টিভিস্ট বিবিসি পার্সিয়ানকে বলেন, আমার এক বন্ধু তার ভাইয়ের খোঁজে সেখানে (কাহরিজাক) গিয়েছিল এবং সে নিজের দুঃখের কথা ভুলে গেছে। তারা প্রতিটি এলাকা থেকে মৃতদেহ স্তূপ করে রেখেছে। আপনারা সহিংসতার মাত্রার ভগ্নাংশও জানেন না।
লন্ডনভিত্তিক ইরানি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহরাম কোর্দাস্টি মঙ্গলবার বিবিসির ‘নিউজডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘তেহরানের এক সহকর্মীর কাছ থেকে তিনি সর্বশেষ যে বার্তাটি পেয়েছেন তাতে লেখা ছিল- অধিকাংশ হাসপাতাল এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। আমাদের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রক্তের সংকট দেখা দিয়েছে।’
তিনি আরও জানান, দুই-তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে তারা শত শত আহত বা নিহত মানুষের চিকিৎসা দিয়েছেন।
কাস্পিয়ান সাগরের তীরের শহর রাশত-এর একজন বাসিন্দা শহরটিকে এখন চেনা যাচ্ছে না বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় আগুন জ্বলছে।’
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক ইরানি কর্তৃপক্ষকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সব ধরনের সহিংসতা ও দমন-পীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া অগ্রহণযোগ্য। সূত্র: বিবিসি
সুমন/