বিশ্বনেতাদের প্রবল কৌতূহল আর মিত্র দেশগুলোর একাংশের তীব্র সমালোচনার মধ্য দিয়ে দাভোসে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদ। ৫৯টি দেশের সমর্থনের দাবি তুলে ট্রাম্প এই পরিষদের প্রথম সনদে স্বাক্ষর করলেও, বৈশ্বিক এই উদ্যোগ শুরুতেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে চীন ও ফ্রান্সের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর যোগ না দেওয়ার বিষয়টি এই পরিষদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এক বিলিয়ন ডলারের ‘প্রাইভেট ক্লাব’
ট্রাম্পের এই শান্তি পরিষদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এর স্থায়ী সদস্য হতে হলে কোনো দেশকে ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার ফি দিতে হবে। সমালোচকরা বিষয়টিকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার চেয়ে ট্রাম্পের একটি ‘ব্যক্তিগত করপোরেট বোর্ড’ বা ‘ধনীদের ক্লাব’ হিসেবে বেশি দেখছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে যে, এই কমিটি কি আদৌ শান্তির জন্য, নাকি এটি কেবলই ট্রাম্পের একটি ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক দাবার চাল?
চীনের তীব্র সন্দেহ ও জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ
চীন এই আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে বরং ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। বেইজিংয়ের আশঙ্কা, ট্রাম্প আসলে এই পরিষদের মাধ্যমে সরাসরি ‘জাতিসংঘের বিকল্প’ দাঁড় করাতে চাইছেন। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন এই ব্যবস্থাকে দুর্বল হতে দিতে নারাজ। ট্রাম্প নিজেও যখন স্বীকার করেছেন যে এই পরিষদ জাতিসংঘের জায়গা নিতে পারে, তখন বেইজিং এই উদ্যোগকে বৈশ্বিক বহুপাক্ষিকতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
ফ্রান্সের কঠোর অবস্থান ও শুল্ক যুদ্ধের হুমকি
ইউরোপের অন্যতম শক্তি ফ্রান্স এই পরিষদে যোগ দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ফরাসি প্রশাসনের মতে, এই বোর্ড জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফ্রান্সের এই ‘না’ বলায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন, যা পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে ফাটলকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি নরওয়ে, ও সুইডেনের মতো দেশগুলোও আপাতত এই উদ্যোগে শামিল হচ্ছে না।
পরিষদের সদস্য ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকা দেশগুলো
বিতর্ক সত্ত্বেও কিছু দেশ ইতোমধ্যেই এই বোর্ডে যোগ দিয়েছে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে: আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, কসোভো, মরক্কো, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ভিয়েতনাম।
অন্যদিকে ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো আমন্ত্রণ পেলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমনকি খোদ ইউক্রেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান।
ট্রাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য ও গাজা ইস্যু
দাভোসে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার শাসনামলে বিশ্ব এখন অনেক বেশি নিরাপদ। তিনি গাজাকে ‘চমৎকারভাবে পুনর্নির্মাণের’ স্বপ্ন দেখালেও সেখানকার মানবিক সংকট ও ইসরায়েলি হামলা নিয়ে তার নীরবতা সমালোচকদের নজর এড়ায়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বোর্ডের চূড়ান্ত ক্ষমতা ট্রাম্প নিজের হাতে রাখায় এটি একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার বদলে ‘আমেরিকান বোর্ড’ হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘকে গুরুত্বহীন করার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে নাকি এটি কেবল ট্রাম্পের আরেকটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হয়েই থেকে যাবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
‘বোর্ড অব পিস’ কী?
ট্রাম্প গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থতাকারী ২০-দফার গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে এই ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদের ধারণাটি সামনে আনেন।
নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এই পরিকল্পনাকে সমর্থন জানায়—যা এটিকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেয় এবং এই পরিষদকে গাজার নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্নির্মাণ তদারকি করার ম্যান্ডেট (কর্তৃত্ব) প্রদান করা হয়।
কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনা ছিল আরও দীর্ঘমেয়াদী।এই শান্তি পরিষদকে একটি ‘আন্তর্জাতিক সংস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার কাজ হবে সংঘাতপূর্ণ বা সংঘাতের হুমকিতে থাকা অঞ্চলগুলোতে স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং সুশাসন বজায় রাখা।
সনদ অনুসারে, ট্রাম্প এই বোর্ডের ‘অনির্দিষ্টকালের চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন; এমনকি তার দ্বিতীয় মেয়াদের রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি এই পদে বহাল থাকতে পারেন।
এই ‘বোর্ড অব পিস’ একটি ‘ফাউন্ডিং এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ বা প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হবে। এই নির্বাহী বোর্ডে রয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
উল্লেখ্য, টনি ব্লেয়ার মূলত কুখ্যাত ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে। তিনি দাবি করেছিলেন, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে—কিন্তু পরে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এতে ব্রিটিশ জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এই যুদ্ধের ফলে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা, সহিংসতা ও চরমপন্থার বিস্তার ঘটে। অনেকের মতে, এই বিপর্যয়ের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় টনি ব্লেয়ার এড়াতে পারেন না। ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি বিভিন্ন বিতর্কিত রাষ্ট্র ও নেতার উপদেষ্টা হয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন, যা তার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষুণ্ন করে। এসব কারণেই টনি ব্লেয়ারকে যুদ্ধবাজ ও নৈতিকতা-বিবর্জিত রাজনীতিক হিসেবে কুখ্যাত মনে করা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এমন যুদ্ধবাজ নেতা কীভাবে শান্তি পরিষদে যুক্ত হলেন? সূত্র: আল জাজিরা, সিএনএন