১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজের পেশ করা একটি প্রস্তাব সরকারের অনুমোদন পায়। এর মাধ্যমেই প্রায় ছয় দশক পর বিতর্কিত এই ‘ভূমি মালিকানা নিষ্পত্তি’ বা নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি পুনরায় চালু হলো।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিমকম’ (Bimkom) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যদিও ইসরায়েল সামরিক আদেশের মাধ্যমে আগে থেকেই ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে আসছিল এবং ২০২৫ সালে তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, তবে এই নতুন পদক্ষেপটি দখলদারিত্কে একটি আইনি কাঠামো দেবে। সংস্থাটির মতে, এটি মূলত বসতি স্থাপন সম্প্রসারণ এবং বর্ণবাদী শাসনকে আরও শক্তিশালী করার একটি পদ্ধতিগত কৌশল।
বিমকম-এর গবেষণা প্রধান মিশাল ব্রায়ার আল জাজিরাকে বলেন, ফিলিস্তিনিদের একটি বড় অংশের জন্য এই নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অসম্ভব হবে। কারণ, ব্রিটিশ বা জর্ডান আমলের পুরনো দলিলপত্র উপস্থাপন করে মালিকানা প্রমাণ করা তাদের অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। পশ্চিম তীরের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমিই বর্তমানে অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে।
ইসরায়েল সরকারের লক্ষ্য হলো আগামী চার বছরের মধ্যে অনিবন্ধিত এই ভূমির ১৫ শতাংশের মালিকানা নিষ্পত্তি করা। এজন্য ২০২৬ সালের বাজেটে আলাদা তহবিল ও প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
সম্পূর্ণ ভূখণ্ড দখলের পায়তারা
১৯৬৮ সালে ইসরায়েল অধিকৃত গাজা ও পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্থগিত করে দিয়েছিল। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য বংশপরম্পরায় জমির মালিকানা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ এবং ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হওয়া অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছেন অথবা সেগুলো এখন তাদের নাগালের বাইরে।
ইসরায়েলি বসতি বিরোধী সংগঠন ‘পিস নাউ’ (Peace Now) এই পদক্ষেপকে পশ্চিম তীরের ‘পূর্ণাঙ্গ সংযুক্তি’বা দখলের প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির সদস্য হাগিত অফরান বলেন, “ইসরায়েল এমন সব কাগজপত্র চাইছে যা ১০০ বছর আগের ব্রিটিশ বা জর্ডান আমলের। খুব কম ফিলিস্তিনির পক্ষেই তা প্রমাণ করা সম্ভব হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ওই জমিগুলো ইসরায়েলের নামে নিবন্ধিত হয়ে যাবে।”
নজিরবিহীন উচ্ছেদ
এর আগে ২০১৮ সালে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমেও একই ধরনের ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করেছিল ইসরায়েল। বিমকম-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সেখানে নিবন্ধিত জমির মাত্র ১ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের নামে হয়েছে। বাকি সব জমি ইসরায়েল রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত ইসরায়েলি মালিকানাধীন হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক আদালত (আইসিজে) ২০২৪ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছিল যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের এই দীর্ঘমেয়াদী দখলদারত্ব অবৈধ এবং তা দ্রুত বন্ধ করা উচিত। আদালত স্পষ্ট করে বলেছিল, জমি বাজেয়াপ্ত বা জনসংখ্যা স্থানান্তরের মতো কর্মকাণ্ডের কোনো আইনি বৈধতা নেই।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ইসরায়েল সরকার এখন তাদের উদ্দেশ্য আর গোপন রাখছে না। তারা বসতি বাড়িয়ে ফিলিস্তিনিদের যতোটা সম্ভব ক্ষুদ্র একটি এলাকায় বন্দি করে ফেলতে চায়। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/