সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের চলমান বিরোধে সুবিধা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপগুলোকে সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। একজন বর্তমান ও একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আই-কে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
একজন বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তা জানান, অন্তত একটি গোষ্ঠী— আমেরিকান জিউস কমিটি (এজেসি)—কে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল যেন তারা সৌদি আরবে কথিত ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দেয়। এজেসি ওয়াশিংটনে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এর বর্তমান প্রধান হলেন সাবেক মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য টেড ডয়েচ।
আমিরাতের এই পদক্ষেপ মূলত ২০২১ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগকে কাজে লাগানোর একটি প্রচেষ্টা। ওই চুক্তির পর এজেসি আবুধাবিতে ‘দ্য সিডনি লার্নার সেন্টার ফর আরব-জেউস আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ নামে একটি শাখা অফিস খোলে, যার লক্ষ্য হলো মুসলিম-ইহুদি সংলাপ এবং ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধ করা। তবে এই বিষয়ে মিডল ইস্ট আই-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে এজেসি কোনো মন্তব্য করেনি।
এজেসি প্রকাশ্যে আমিরাত-সৌদি বিরোধে জড়াতে না চাইলেও অন্যান্য গোষ্ঠী ইতিমধ্যে এতে অংশ নিয়েছে। অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) গত জানুয়ারিতে এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছিল যে, সৌদি আরবের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বরগুলো ক্রমশ ইহুদিবিদ্বেষী ভাষা ব্যবহার করছে এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, এডিএল ২০২৩ সালে আবুধাবিতে ‘আল মানারা সেন্টার’ চালু করতে আমিরাতের সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। এই প্রথম আমিরাতি লবিংয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততার খবর সামনে এলো।
ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলার এই লবিং আমিরাতের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ, যা ইতোমধ্যে মার্কিন প্রশাসনের নজরে এসেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, দুই দেশের রাজনৈতিক বিরোধ এখন ধর্মীয় রূপ নিচ্ছে। ওয়াশিংটনে সৌদি আরবের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এই ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরবও সক্রিয় হয়েছে। গত মাসে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটন সফরে এজেসি এবং এডিএল-এর মতো ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের পর সৌদি কর্মকর্তারা এজেসি-র সঙ্গে ফলো-আপ বৈঠকও করেছেন। একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা একে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ‘ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পুরানো মিত্রদের মধ্যে দ্বন্দ্ব
এক সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও আমিরাতের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে কয়েক বছর আগেই। তবে গত ডিসেম্বরে ইয়েমেনে আমিরাতি মিত্রদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব পাল্টা অভিযান শুরু করলে এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। রিয়াদ এখন ইয়েমেন থেকে আমিরাত ও তাদের স্থানীয় প্রক্সিদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
লোহিত সাগরের ওপারে সুদানেও দুই দেশ মুখোমুখি অবস্থানে। সেখানে সৌদি আরব তুরস্ক ও মিসরের সঙ্গে মিলে সুদান সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ-কে (RSF)। এছাড়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে আমিরাতের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় সৌদি আরব ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
ভূ-রাজনৈতিক এই লড়াই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। সৌদি বিশ্লেষকরা আমিরাতের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলছেন, বিপরীতে আমিরাতপন্থীরা সৌদি আরবে 'চরমপন্থী' আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করছেন। সৌদি শিক্ষাবিদ ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি বলেছেন, ‘আমিরাত জানে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবিদ্বেষ একটি সংবেদনশীল বিষয়, তাই তারা ফায়দা লুটতে একে ব্যবহার করছে। কিন্তু এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।’
গাজা যুদ্ধ ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে আরও বেশি দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের চুক্তিতে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাজাখস্তান ছাড়া এখন পর্যন্ত এতে খুব একটা সাড়া মেলেনি।
সৌদি আরব কখনোই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি। ২০০২ সালে তারা ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিনিময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিল। বাইডেন প্রশাসনও সৌদি-ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া যেকোনো আলোচনার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। গাজায় ইতোমধ্যে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং জাতিসংঘ একে গণহত্যা বলে আখ্যা দিয়েছে।
গাজা এবং লেবানন-সিরিয়ায় হামলার কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি ও এমনকি মিসরের সম্পর্ক শীতল হলেও আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা বজায় রয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
মাহফুজ/