বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দক্ষিণ-পশ্চিমে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে শুরু করে উত্তর দিকে এগোলে মেহেরপুর-২ পর্যন্ত দলটি বিজয় লাভ করেছে। এ ছাড়া সীমান্ত থেকে কিছুটা ভেতরে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া আর পাবনার অনেক আসনও জামায়াতের জোটের দখলে গেছে। রাজশাহী-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। উত্তরাঞ্চলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামেও অনেক আসনে তারাই বিজয়ী হয়েছে।
সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামীর জোট যেসব এলাকায় জিতেছে, সেগুলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর কিছুটা আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল। ওই অঞ্চলগুলোতে জামায়াতে ইসলামী ও তার জোটসঙ্গীদের জয়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশ্লেষকরা গভীরভাবে আমলে নিয়েছেন। তারা মনে করছেন জামায়াতের এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে, বিশেষত আগামী মাস (মার্চ) ও এপ্রিলে রাজ্যটিতে হতে যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনে এর প্রভাব দেখা যাবে।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে তাদের মতামত তুলে ধরা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তাদের বিরোধীদলগুলো–অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্য দলগুলো কারা কীভাবে সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের জয়ের ব্যাখ্যা করছে আর মানুষের সামনে তুলে ধরছে, তার ওপরেই নির্ভর করবে এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই একটা নির্বাচনি এজেন্ডা হয়ে থেকেছে। বিজেপি বরাবরই বলে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সেসব অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলগুলো মদদ দেয়।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, এরকম অভিযোগ বাম আমলেও ছিল এবং বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে সেসব কথিত অনুপ্রবেশকারীকে মদদ দেওয়া আরও বেড়েছে। বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে বিজয়ী হয়েছে, সেটা একটা প্রসঙ্গ। সেই আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জামায়াতের এই ফলাফলের মারাত্মক প্রভাব পড়তে বাধ্য।’
বিজেপি নেতা বিমল শঙ্কর নন্দ অভিযোগ করেন, ‘যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে আমাদের রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের, সেখানে অনেকটা অংশেই এখনো কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যায়নি। এর একটা বড় কারণ রাজ্য সরকারের জমি দিতে অনীহা। তারা তো চাইবেই না যে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হোক, নাহলে অনুপ্রবেশ চলতে থাকবে কী করে? রাজ্যের শাসক দল তো চায় যে অনুপ্রবেশ হোক, সীমান্তের জেলাগুলোতে জনবিন্যাস বদলে যাক।’
তিনি দাবি করেন, জামায়াতের মতো কট্টরপন্থি সংগঠনগুলো সেই সুযোগ নেবে, সীমান্ত দিয়ে আরও মানুষ পাঠাবে ভারতে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গবাসী আতঙ্কিত বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির জয়ে তাদের উচ্ছ্বাস আটকিয়ে রাখতে পারেননি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ফলাফল ঘোষণার দিন দুপুরেই অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলছিলেন, ‘হিন্দু মৌলবাদ আর ইসলামি মৌলবাদ তো একে অন্যের পরিপূরক। ও দেশে যা জামায়াতে ইসলামী, আমাদের দেশে সেটাই বিজেপি, একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’ তিনি আরও বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অঞ্চলজুড়ে সব এলাকাতেই বিজেপি তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট থেকেই। আবার ভারতের এই হিন্দু মৌলবাদ দেখিয়েই ঠিক এই অঞ্চলজুড়ে সীমান্তের অন্য প্রান্তেও জামায়াতে ইসলামী শক্তি বৃদ্ধি ঘটিয়েছে, এতগুলো আসনে তারা জয়ী হয়েছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর জয়কে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস দুই পক্ষই নিজেদের মতো করে কাজে লাগাবে। একদিকে বিজেপি চেষ্টা করবে কট্টরপন্থিদের বিজয়কে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরূকরণ করতে অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সম্ভবত চেষ্টা করবে বাংলাদেশে যে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা বিএনপি জয়ী হয়েছে, তা তুলে ধরতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনটা নয় যে, এবারের ভোটে হঠাৎ করে জামায়াত এসব আসন জিতেছে। ‘দ্য ওয়াল’ সংবাদ পোর্টালের কার্যনির্বাহী সম্পাদক অমল সরকার বলেন, ‘আগে থেকেই সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে ইসলামপন্থি দলগুলো শক্তিশালী। তবে বিজেপি চাইবে যে, সীমান্তে জামায়াত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তাই হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার–এমন একটি প্রচার চালাতে।’
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য ব্যাখ্যায় বলেন, ‘শুধু যে পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামী খুব ভালো ফল করেছে তা নয়, পার্শ্ববর্তী আসামের সীমান্ত লাগোয়া কিছু অঞ্চলেও জয়ী হয়েছে জামায়াত। ঠিক এই অঞ্চলেই আমাদের দেশে বিজেপি খুবই শক্তিশালী, শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনা বাদ দিলে।’ তিনি মনে করেন, ‘জামায়াতের এই জয় নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করার চেষ্টা করবেই। সীমান্তে জামায়াত এসে গেছে, এবার পশ্চিমবঙ্গেও ঢুকে পড়বে–এসব বলবে। কিন্তু বিজেপিবিরোধীরা বাংলাদেশের সামগ্রিক নির্বাচনি ফলাফলকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।’ বাকিটা কোনদিকে যাবে, তা নির্ভর করছে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারের ওপর। সূত্র: বিবিসি