বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৭ হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত থাকলেও এর একটি বড় অংশই আজ অস্তিত্ব সংকটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্তত ৩,০০০ ভাষা অর্থাৎ মোট ভাষার প্রায় ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ এখন ‘বিপন্ন’ বা বিলুপ্তপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত।
শীর্ষে ইংরেজি ও মান্দারিন
বিশ্বের ১৮৬টি দেশে প্রায় ১৫০ কোটি মানুষ ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভাষায় পরিণত করেছে। তবে এই ইংরেজি ভাষাভাষীদের ৮০ শতাংশই এটি দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন।
অন্যদিকে, মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মান্দারিন চাইনিজ, যার বক্তা সংখ্যা প্রায় ১২০ কোটি। তালিকায় এর পরেই রয়েছে হিন্দি (৬০ কোটি ৯ লাখ), স্প্যানিশ (৫৫ কোটি ৯ লাখ) এবং আধুনিক মানক আরবি (৩৩ কোটি ৫ লাখ)।
লিপি ও লিখন পদ্ধতি
বিশ্বে বর্তমানে ২৯৩টি পরিচিত লিপি রয়েছে। এর মধ্যে ১৫৬টি এখনও সচল থাকলেও প্রাচীন মিসরীয় হায়ারোগ্লিফিক বা অ্যাজটেক পিকটোগ্রামের মতো ১৩৭টি লিপি এখন আর ব্যবহৃত হয় না। ল্যাটিন লিপি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী লিখন পদ্ধতি, যা বিশ্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ ব্যবহার করেন।
কেন ভাষা বিপন্ন হয়?
একটি ভাষা তখনই বিপন্ন হয়ে পড়ে যখন কোনো জনগোষ্ঠী তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার বদলে অন্য কোনো প্রভাবশালী ভাষা (যেমন ইংরেজি বা স্প্যানিশ) পৌঁছে দিতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের ৩,১৯৩টি ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
সুপ্ত ভাষা: ৩৩৭টি ভাষা এমন অবস্থায় আছে যার কোনো দক্ষ বক্তা নেই, কিন্তু ওই জাতির পরিচয়ের অংশ হিসেবে এটি এখনও টিকে আছে।
বিলুপ্ত ভাষা: ৪৫৪টি ভাষা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা বলার মতো আর কেউ বেঁচে নেই।
পরিসংখ্যান বলছে, ১,৪৩১টি ভাষা এমন আছে যেগুলোর বক্তা সংখ্যা ১,০০০ জনেরও কম। এছাড়া ১১০টি ভাষা টিকে আছে মাত্র ১০ জনেরও কম মানুষের মুখে।
সবচেয়ে বিপন্ন ভাষাগুলো কোথায়?
বিশ্বের মাত্র ২৫টি দেশে বিপন্ন ভাষাগুলোর ৮০ শতাংশের অবস্থান। ভৌগোলিকভাবে ওশেনিয়া অঞ্চলে বিপন্ন ভাষার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যার পরে রয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশ।
ওশেনিয়া: অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ভাষা ‘যুগাম্বে’ (Yugambeh) এখন অত্যন্ত বিপন্ন। তবে বর্তমানে বিভিন্ন অ্যাপ ও শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
এশিয়া: জাপানের ‘আইনু’ (Ainu) ভাষাটি এখন চরম সংকটে। ২০০৬ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, ২৩ হাজার ৭৮২ জন আইনু জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে মাত্র ৩০৪ জন এই ভাষাটি জানতেন।
আফ্রিকা: ইথিওপিয়ার ‘অনগোটা’ (Ongota) ভাষাটি বিলুপ্তির পথে। ৪০০ সদস্যের ওই জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন বৃদ্ধ এখন এই ভাষায় কথা বলতে পারেন।
আমেরিকা: উত্তর ও মধ্য আমেরিকার প্রায় সব আদিবাসী ভাষাই এখন বিপন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘লুইজিয়ানা ক্রেওল’ এবং বলিভিয়ার ‘লেকো’ ভাষা এখন শুধুমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ইউরোপ: ইংল্যান্ডের কর্নওয়াল অঞ্চলের ‘কর্নিশ’ (Cornish) ভাষাকে ইউনেস্কো একসময় বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। তবে পুনরুজ্জীবন প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে ৫ শতাধিক মানুষ এই ভাষায় কথা বলছেন। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/