‘‘আমরা ভূমধ্যসাগরের জলে একসঙ্গে হেঁটেছি। এরপর ভূমধ্যসাগর, গঙ্গা আর জর্ডান নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে—যদিও জর্ডান দিয়ে কিছুটা কম।’’
২০১৭ সালের ঐতিহাসিক সফরের পর থেকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নিজের বন্ধুত্বকে এভাবেই বর্ণনা করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেই সফরে ভারত ও ইসরায়েল পানি এবং কৃষি খাতে কৌশলগত অংশীদারত্বসহ একগুচ্ছ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল।
আগামীকাল বুধবার মোদি দুই দিনের সফরে ইসরায়েল ফিরছেন। নেতানিয়াহুর মতে, এই সফর দুই দেশের মধ্যকার সেই ‘বিশেষ সম্পর্ককে’ আরও জোরালো করবে—যে শব্দবন্ধটি সাধারণত কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘‘এই সপ্তাহে ভারত নামক বিশ্বশক্তি এবং তার নেতা প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে ইসরায়েলের যে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।’’
সফরের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
মোদির এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা প্রবল এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর ছায়াতলে এই যুদ্ধ চলছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু নিজেও আগামী ৯ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত আড়াই বছর ধরে ভারত ইসরায়েলকে শ্রমশক্তি, অস্ত্র এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে আসছে, এমনকি যখন হেগের আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলছে। গাজা যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মোদীই প্রথম বিশ্বনেতা যিনি নেতানিয়াহুকে ফোন করেছিলেন, যা গাজা যুদ্ধে ভারতের অটল সমর্থনের পথ প্রশস্ত করে।
নেতানিয়াহুর জন্য এই সফর হবে মোদিকে ধন্যবাদ জানানোর একটি সুযোগ এবং এর মাধ্যমে তিনি নিজ দেশে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলোর কাছে পৌঁছানোর পথ তৈরি করবেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মোদি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ ভাষণ দেবেন, যা কেবল বিশেষ অতিথিদের জন্য বরাদ্দ। তিনি জেরুজালেমে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং হলোকাস্ট মিউজিয়াম পরিদর্শন করবেন। তবে মোদি অধিকৃত পশ্চিম তীর বা গাজা সফর করবেন না। এমনকি ফিলিস্তিন ইস্যু বা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন বসতি স্থাপনের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।
আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু: প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতি
মোদি সরকারের অধীনে ভারতের প্রতিরক্ষা খাত ইসরায়েলের সামরিক-শিল্প ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ইসরায়েল থেকে ভারতের অস্ত্র কেনা ১৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ভারত বর্তমানে ইসরায়েলি ড্রোন, মিসাইল সিস্টেম এবং নজরদারি প্রযুক্তির বৃহত্তম ক্রেতা।
মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় ভারত এখন ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন করছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার দাবি উঠছিল, তখনও ভারত ও ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শক্তিশালী করতে একমত হয়েছিল।
বুধবারের বৈঠকে দুই নেতা গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্র উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর জোর দেবেন। হিন্দুস্তান টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত ও ইসরায়েল যৌথভাবে ‘অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম’ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। আগামী কয়েক বছরে এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ডিসেম্বরের শেষদিকে ইসরায়েলি পত্রিকা ‘জেরুজালেম পোস্ট’ এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছিল যে, ৮.৭ বিলিয়ন ডলারে ইসরায়েলের কাছ থেকে ১ হাজার ‘স্পাইস বোমা’ ক্রয় করবে ভারত। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (ডিএসি) বিশাল অঙ্কের এ অস্ত্র ক্রয় প্যাকেজে এই অনুমোদন দিয়েছিল। মোদির সফরে এ চুক্তি চুড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হবে কি না, তা এখনো বলা হয়নি। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা এ সংক্রান্ত আলোচনা বা চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিস্তারিত জানতে আরও পড়ুন: ৮.৭ বিলিয়ন ডলারে ইসরায়েলের কাছ থেকে ১ হাজার ‘স্পাইস বোমা’ কিনছে ভারত
ইরান ও আঞ্চলিক জোট
নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে একটি ‘হেক্সাগন’ বা ছয়পক্ষীয় জোট গড়ার আভাস দিয়েছেন, যার মধ্যে ভারত, আরব দেশসমূহ, আফ্রিকা এবং ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো (গ্রিস ও সাইপ্রাস) অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটিকে মূলত ইরান-বিরোধী একটি পশ্চিমাঘেঁষা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্লক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
মোদীর এই সফর ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রশংসিত হলেও দেশের ভেতরে মানবাধিকার কর্মী এবং ফিলিস্তিনপন্থীদের পক্ষ থেকে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভগুলো কঠোরভাবে দমন করেছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ এই সফরের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সফরের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে সরাসরি কোনো বিরোধিতা করেননি।
ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত রুভেন আজার এই সফরকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘‘ভারত ও ইসরায়েলের এই সম্পর্ক কেবল একটি সাধারণ বৈঠক নয়; এটি বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক অংশীদারত্ব।’’ সূত্র: মিডল ইস্ট আই
মাহফুজ/