ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া এক দফার বৈঠক নিয়ে প্রথমে তেহরান আশাবাদ ব্যক্ত করলেও একদিন পরেই সুর কিছুটা পাল্টেছে। তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে, চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ওয়াশিংটনকে ‘অতিরিক্ত দাবি’ থেকে সরে আসতে হবে। ওই আলোচনা থেকে চুক্তিতে আসতে পারেনি কোনো পক্ষই।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে হলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড ইসরায়েল উপকূলে পৌঁছানোর কথা থাকায়, দেশটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়।
দূতাবাস তাদের ওয়েবসাইটে জানায়, ‘বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু থাকা অবস্থায় ইসরায়েল ছাড়ার কথা বিবেচনা করতে পারেন।’ নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি গত শুক্রবার সকালে দূতাবাসের কর্মীদের ইমেইলে লিখেছেন, যারা যেতে চান তারা যেন ‘আজই’ দেশ ছাড়েন।
তিনি লিখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘যেকোনো গন্তব্যে যাওয়ার টিকিট জোগাড়ের দিকে মনোযোগ দিন, সেখান থেকে পরে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়া যাবে। তবে প্রথম অগ্রাধিকার হবে দ্রুত দেশত্যাগ।’
সংঘাতের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় চীনও শুক্রবার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের নাগরিকদের ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ইরান ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ইরানকে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম দেন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে। ইরান জোর দিয়ে বলেছে, আলোচনা কেবল পারমাণবিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চায়, তেহরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করুক এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করুক।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত বৃহস্পতিবার জানায়, ট্রাম্পের আলোচক দল ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা এবং অবশিষ্ট সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের দাবি তুলবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘এই পথে সফল হতে হলে অপর পক্ষের পক্ষ থেকে গম্ভীরতা ও বাস্তববাদ প্রয়োজন এবং কোনো ভুল হিসাব ও অতিরিক্ত দাবি এড়িয়ে চলতে হবে।’ তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো দাবির কথা উল্লেখ করেননি।
বৈঠক অব্যাহত থাকবে
গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় বৈঠকের পর আরাগচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানান, আলোচনায় ‘খুব ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে এবং পারমাণবিক ও নিষেধাজ্ঞা দুই ক্ষেত্রেই চুক্তির মূল উপাদান নিয়ে ‘গভীরভাবে’ আলোচনা হয়েছে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি জানান, আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পর আমরা আজকের বৈঠক শেষ করেছি।’
জাতিসংঘের পারমাণবিক প্রধানও এই আলোচনায় যোগ দিয়েছেন বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এদিকে, চলতি সপ্তাহে দেওয়া স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘ইতোমধ্যে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা ইউরোপ এবং বিদেশে আমাদের ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, এবং তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করছে যা শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরান ‘অশুভ পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ অনুসরণ করছে। যদিও তেহরান বরাবরই বলেছে, তাদের কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে। এই অভিযোগগুলো একই মঞ্চে তোলা হয়, যেখানে ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ‘বড় মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছে।
‘চরম উদ্বিগ্ন’
জেরাল্ড আর. ফোর্ড মোতায়েনের আগেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজ ছিল, যার মধ্যে আরেকটি বিমানবাহী রণতরিও রয়েছে। গত জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর আগের এক দফা আলোচনা ভেঙে পড়ে। এতে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও অল্প সময়ের জন্য ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলায় অংশ নেয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে তিনি ‘চরমভাবে উদ্বিগ্ন’। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘বিবেকের কণ্ঠস্বরই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে।’
তুর্ক আরও বলেন, গত মাসে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমনে তেহরান ব্যাপক ধরপাকড় চালায়, যেখানে অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী হাজারও মানুষ নিহত হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যা দেখিয়ে দেয় যে মূল অসন্তোষ এখনো রয়ে গেছে। সূত্র: এএফপি