যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সপ্তম দিনে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে তীব্র বিমান হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, এই বোমাবর্ষণ ‘আরও নাটকীয়ভাবে বাড়তে যাচ্ছে’।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের শঙ্কা ঘনীভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এমন অবস্থান ব্যক্ত করলেন তিনি। গতকাল শুক্রবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের শর্তহীন আত্মসমর্পণ ছাড়া এই যুদ্ধ বন্ধের আর কোনো পথ খোলা নেই। এরপর একজন মহান ও গ্রহণযোগ্য নেতা (বা নেতৃবৃন্দ) নির্বাচনের পর আমরা এবং আমাদের অনেক চমৎকার, অত্যন্ত সাহসী মিত্র ও অংশীদাররা ইরানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করব। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে আরও বড়, উন্নত এবং শক্তিশালী করে তুলব।’
এদিকে পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইসরায়েলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে দেশটি। ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে। হামলার পর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। শুধু প্রধান বিমানবন্দর নয়, ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। লাইভ ফুটেজে তেল আবিবের আকাশে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে। সেগুলোকে ঠেকাতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেও কাজ করতে দেখা গেছে।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তেহরানে ইরানের একটি সামরিক কমান্ড বাংকার ধ্বংস করা হয়েছে। আইডিএফের মতে, ৫০টি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের অংশ নেওয়া এক হামলায় ওই ভূগর্ভস্থ বাংকারটি ধ্বংস করা হয়। তাদের দাবি, এটি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। খামেনি বাংকারটি ব্যবহার করার আগেই তাকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়। এই বাংকারটি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একাধিক সড়কের নিচে বিস্তৃত ছিল এবং এটি সর্বোচ্চ নেতার ‘নিরাপদ জরুরি কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আইডিএফ আরও বলেছে, এই বাংকারটি এখনো ইরানি সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ব্যবহার করছিলেন।
এ ছাড়া শুক্রবার (৬ মার্চ) সকালে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা তেহরানে নতুন করে হামলার একটি ধাপ শুরু করেছে। তাদের দাবি, এই হামলায় ‘শাসনব্যবস্থার অবকাঠামো’ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং এটি যুদ্ধের ‘নতুন পর্যায়’।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান ইরানের ভেতরে গভীরে মাটির নিচে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে কয়েক ডজন ‘পেনিট্রেটর’ বোমা ফেলেছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও আল জাজিরার সাংবাদিকদের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিস্ফোরণ হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, আবাসিক ভবন এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ ভাল জানান, সর্বশেষ হামলার সময় তিনি জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। ইরানের নূর নিউজ জানায়, তেহরানের কিছু আবাসিক ভবনেও হামলা হয়েছে। একটি ইরানি সামরিক একাডেমিতেও আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র, ঠিক তখনই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সাংবাদিক ঘটনাস্থলের কাছ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, তেহরানের নিলুফার স্কয়ারের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ধ্বংস হয়ে যাওয়া শ্রেণিকক্ষের ভিডিও প্রকাশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে একাধিক স্কুলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুদ্ধের প্রথম দিন দক্ষিণের মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ১৬৫ জন ছাত্রী ও কর্মী নিহত হয়েছিল। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ইরানে হামলায় নিহত ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের মধ্যে অন্তত ১৮১ জন শিশু।
তেহরান থেকে আল জাজিরার আরেক প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, রাজধানীতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বোমাবর্ষণ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত আমরা লাগাতার বড় ধরনের হামলা দেখেছি। বিস্ফোরণের কম্পন আল জাজিরা ব্যুরো পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে।’ তার ভাষায়, আগের দিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার রাতভর রাজধানীতে অনেক বেশি ভারী বোমাবর্ষণ হয়েছে। আকাশে যুদ্ধবিমান দেখা গেছে এবং বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় শহর ঢেকে যায়। তিনি জানান, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল পাস্তুর স্ট্রিটের আশপাশের এলাকা। এটি অত্যন্ত নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি অঞ্চল, যেখানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে এখানেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। এই সড়কেই ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ও অবস্থিত। এ ছাড়া আবাসিক ভবন, গাড়ি পার্কিং এলাকা, পেট্রলস্টেশনসহ কিছু বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
মধ্যস্থতার উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে হওয়া উচিত: ইরানের প্রেসিডেন্ট
গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, যদি কোনো মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকেই লক্ষ্য করে হওয়া উচিত। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমরা এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির পক্ষে। কিন্তু আমাদের জাতির মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমরা একটুও দ্বিধা করব না। মধ্যস্থতার চেষ্টা তাদের উদ্দেশ্যেই হওয়া উচিত, যারা ইরানের জনগণকে অবমূল্যায়ন করেছে এবং এই সংঘাত শুরু করেছে।’
শিরাজে ২০ জন নিহতের খবর
ইরানের শিরাজ, কুম, ইসফাহান ও কেরমানশাহ শহরেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি রয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১ হাজার ৩৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। ফার্স প্রদেশের উপ-গভর্নর জালিল হাসানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, শিরাজের জিবাশাহর এলাকায় এক হামলায় ২০ জন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন। বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ওই শহরে দুজন প্যারামেডিকও নিহত হয়েছেন।
কুয়েত উপকূলে তেলবাহী জাহাজে হামলা
ইরানের সামরিক বাহিনী গতকাল জানায়, আগামী দিনগুলোতে তারা হামলার পরিসর আরও বাড়াবে। এর কিছুক্ষণ পরই তারা দাবি করে, কুয়েত উপকূলের কাছে ‘মার্কিন মালিকানাধীন’ একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় রেডিও জানায়, জাহাজটি হামলার আঘাতে আগুনে পুড়ছে। এই তথ্য দেওয়া হয়েছে খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের বরাত দিয়ে, যা যুদ্ধের সময় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড পরিচালনা করে।
স্থলবাহিনী নিয়ে যা বলছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র
এদিকে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল হামলা চালায়, তার মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এমন হামলা হলে তা ওয়াশিংটনের জন্য ‘বড় বিপর্যয়’ হবে। এ ছাড়া ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেনা পাঠালে তাদের মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে ইরানিরা। মার্কিন সেনারা ইরানে ঢোকার ‘দুঃসাহস’ দেখালে তাদের আটক ও হত্যা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মূলত প্রথম দিন থেকেই গুঞ্জন রয়েছে, ইরানে স্থলভাগে সেনা পাঠাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি গণমাধ্যমে খবর এসেছে, কুর্দিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব মন্তব্যকে গুরুত্ব দেননি। তিনি বলেন, এখন স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা ‘সময়ের অপচয়’। মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসিকে তিনি বলেন, ‘এটা সময়ের অপচয়। তারা সবকিছু হারিয়েছে। তাদের নৌবাহিনী হারিয়েছে। তারা হারানোর মতো সবই হারিয়েছে।’ ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বলেছেন, নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ না করলে কোনো চুক্তি হবে না ইরানের সঙ্গে।
নেতা নির্বাচন গোপন রেখেছে ইরান?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পর থেকেই দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিয়ে চলছে অনিশ্চয়তা। তার উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়েও সামনে আসছে নানা তথ্য। অনেকেই দাবি করছেন, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়তো এরই মধ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে সেটি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোহরেহ খারাজমি বলছেন, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হয়তো নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি ‘যৌক্তিক’।
তেলের দাম বেড়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে এমন আশঙ্কার পর তেলের দাম বেড়ে গেছে। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, এ অঞ্চল বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ‘বিশ্ব অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ফেলতে পারে।’
গতকাল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ দশমিক ১৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বৃহস্পতিবারের বাজার বন্ধের তুলনায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। কাবি আরও বলেন, যদি জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে না পারে, তাহলে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান