যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এরপর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মোজতবা খামেনির এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে ইরানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
সরকারপন্থি কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে উদ্যাপন করেছেন। তাদের মতে, ক্ষমতাধর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ একজন কট্টরপন্থি নেতা ক্ষমতায় আসায় দেশের নীতি আগের ধারাতেই চলবে।
অন্যদিকে অনেক ইরানি মনে করছেন, এতে দেশের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। তেহরানে বসবাসকারী ত্রিশের কোঠার এক ব্যক্তি বিবিসিকে বলেন, ‘ব্যবস্থার ভেতরে পরিবর্তনের যে সামান্য সম্ভাবনাও ছিল, সেটিও এখন আর নেই।’
তিনি বলেন, ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’, যারা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে, তারা আলি খামেনির সবচেয়ে কাছের কাউকেই বেছে নিয়েছে। তার ভাষায়, ‘সবকিছু আগের মতোই থাকবে। নতুন নেতাকে সমর্থন করতে তাদের স্লোগানও বদলাতে হবে না।’
দীর্ঘদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল যে মোজতবা খামেনি আড়ালে থেকে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে বড় প্রভাব রাখতেন। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, তিনি তার বাবার কঠোর নীতিই অনুসরণ করবেন। তেহরানের এক নারী জানান, তার ধারণা মোজতবা খামেনি তার বাবার চেয়েও কঠোর হবেন।
তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই আশা করি যুদ্ধেই তাদের (উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের) জীবন শেষ হবে। না হলে যদি আমরা তার শাসনের অধীনে থাকি, তাহলে আমাদের সবার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।’
তেহরানের আরেকজন ত্রিশোর্ধ্ব বাসিন্দা বলেন, ‘তিনি প্রতিশোধপরায়ণ। তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, তিনি এটা ভুলবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপরই এর প্রভাব পড়বে।’
৫৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতা তার বাবার শাসনামলে বেশির ভাগ সময়ই আড়ালে ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যায়, তিনি প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার কাছে মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং ক্ষমতার ভেতরের অনেক সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখতেন।
২০০০ সালের শেষদিকে উইকিলিকসের মাধ্যমে প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে ‘আড়ালের প্রকৃত ক্ষমতাধর ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে তাকে ‘দক্ষ ও শক্তিশালী নেতা’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়।
আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছাড়াও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজকে প্রভাবিত করেছেন। তেহরানের চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী বলেন, তার মতে মোজতবা খামেনি ‘তার বাবার চেয়েও খারাপ’। তিনি বলেন, ‘যদি তিনি বেঁচে থাকেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।’
গত রবিবার তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচনের আগে অনেক মানুষ তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘এই সরকারের সমর্থক ছাড়া কেউ তাকে গ্রহণ করছে না।’
অন্যদিকে সমর্থকরা গত সোমবার তেহরানের এঙ্গেলাব স্কয়ারে জড়ো হয়ে নতুন নেতাকে স্বাগত জানান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও বড় জনসমাবেশের ছবি দেখানো হয়, যেখানে মানুষ নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
সেখানে অনেকেই মোজতবা খামেনি ও তার বাবার ছবি হাতে নিয়ে পতাকা নেড়ে উদ্যাপন করেন এবং গাড়ির হর্ন বাজান।
এক সমর্থক রয়টার্সকে বলেন, ‘এখন আমরা নিশ্চিত যে তার নেতৃত্বে আমাদের পথচলা অব্যাহত থাকবে।’ আরেক নারী বলেন, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত, কারণ মোজতবা খামেনি ‘অনেকটাই তার বাবার মতো।’ তার মতে, ‘সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে যোগ্য এবং সাবেক নেতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।’
তেহরানের কাছে কারাজ শহরের এক তরুণ বলেন, নিয়োগের আগে তিনি মোজতবা খামেনি সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। তিনি বলেন, ‘এখন দেখা যাবে ট্রাম্প তাদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করেছেন কি না।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান এবং মোজতবা খামেনি তার কাছে ‘গ্রহণযোগ্য নন’।
নিয়োগ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প বলেন, তার অনুমোদন ছাড়া যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সে ‘দীর্ঘদিন টিকতে পারবে না।’ ইসরায়েলও সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, আলি খামেনির ছেলে নতুন নেতা হলেও তারা ‘তার উত্তরসূরিদের লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রাখবে।’ সূত্র: রয়টার্স