যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বললেও তারা গোপনে ইরানে স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ।
রবিবার (২৯ মার্চ) রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকজন প্রস্তুত আছে। মার্কিন সেনারা স্থলে নামলেই তাদের আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদেরও চূড়ান্তভাবে জবাব দেওয়া হবে।’
এদিকে ইসরায়েলি হামলা তীব্র হওয়ার মধ্যে ইরানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানী তেহরান ও আশপাশের অঞ্চল এবং আলবোরজ প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলার কারণে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হচ্ছে।
এ হামলাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে রাজি না হলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো হবে। তিনি আলোচনার সময়সীমা ১০ দিন বাড়িয়ে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত করেছেন এবং একটি ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা দিয়েছেন, যাকে সমালোচকরা ‘অত্যন্ত কঠোর’ বলছেন।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, পেন্টাগন কয়েক সপ্তাহের সীমিত স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে খার্গ দ্বীপ, যা ইরানের তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং হরমুজ প্রণালি-সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা।
যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সেনা উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ইউনাইটেড স্টেটস সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা ইউএসএস ত্রিপোলি জাহাজে করে অঞ্চলে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের আরও হাজার হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা গত রবিবার তেহরানে অস্ত্র গবেষণা ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ১২০টির বেশি বোমা ফেলেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২ হাজার ৭৬ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ২১৬ জন শিশু রয়েছে।
মেহর নিউজ এজেন্সি জানায়, ওসমাভানদান গ্রামের একটি আবাসিক এলাকায় মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছে। এতে পাঁচটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং ২২টি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসফাহান শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও হামলা হয়েছে, এতে চারজন কর্মচারী আহত হয়েছেন। এর আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা অঞ্চলটির দুটি মার্কিন বা ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করবে।
ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলায় অন্তত ২৫০ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিহত হয়েছেন।
গত রবিবার তেহরানে কাতারের আল-আরাবি টিভির অফিস থাকা একটি বাণিজ্যিক ভবনেও হামলা হয়। বিস্ফোরণে ভবনের দেয়াল ও জানালা উড়ে যায়। ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ রেজা শাদেমান বলেন, ‘আমরা বেঁচে গেছি, এটা অলৌকিক ঘটনা। এখানে কোনো সামরিক লক্ষ্য ছিল না।’
এদিকে সংঘর্ষ বাড়ার মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষতিপূরণ, ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ, যুদ্ধবিরতি, ভবিষ্যৎ সংঘাত প্রতিরোধ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
গত রবিবার ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া সাত দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তারা শনাক্ত করেছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায়। ইসরায়েলের নেগেভ অঞ্চলের একটি শিল্প এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যেখানে কীটনাশক তৈরির একটি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌভাগ্যক্রমে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র বিরশেবা শহরের কাছে খোলা স্থানে আঘাত হানে। এতে ১১ জন আহত হয়। হাইফা বন্দরের কাছেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে। সংঘাত প্রশমনে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বৈঠক করেছেন।
গালফ অঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ১৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪২টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। সৌদি আরব ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা বলেছে। কুয়েত ও বাহরাইনে সাইরেন বাজানো হয়।
ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এদিকে ইরানের এক নৌ কমান্ডার দাবি করেছেন, তারা হরমুজ প্রণালি-সংলগ্ন জলসীমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং মার্কিন বাহিনী কাছে এলে উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হবে।
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়ছে। তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে পড়ছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। সূত্র: আল জাজিরা