ইরান সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা অনেককেই বিস্মিত করেছে। তবে বিষয়টি হয়তো এতটা অপ্রত্যাশিত নয়। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প তাকে প্রায়ই ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, মুনির ইরানকে ‘অনেকের চেয়েও ভালো বোঝেন’।
ইরান পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ। দুই দেশ প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগাভাগি করে। শুধু তাই নয়, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ’ সম্পর্কের কথাও বলা হয়।
এ ছাড়া পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটি নেই। উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশের মতো এই সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েনি পাকিস্তান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তান নিজেই মধ্যস্থতায় আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হলে সেটি পাকিস্তানের স্বার্থেই যাবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, যে দেশ নিজেই আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে উত্তেজনায় জড়িত, সে কীভাবে শান্তির বার্তা দিচ্ছে?
বর্তমানে পাকিস্তান আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালাচ্ছে, আর ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা গত বছর পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছিল। এখন পর্যন্ত পাকিস্তান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে, দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে, বিভিন্ন মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আতিথ্য দিচ্ছে এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই ভারসাম্য রক্ষা ঝুঁকিমুক্ত নয়। পাকিস্তান আমদানিকৃত তেলের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল, যার বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই সংঘাত সরাসরি তাদের অর্থনীতিতে আঘাত হানতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের এখানে সবচেয়ে বেশি স্বার্থ জড়িত।’
মার্চের শুরুতে পাকিস্তান সরকার পেট্রল ও ডিজেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহও চালু করা হয়েছে। করাচির আইবিএর অধ্যাপক ফারহান সিদ্দিকি বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চাপ ভয়াবহভাবে বাড়বে।’ আরেকটি বড় আশঙ্কা হলো, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে কী হবে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে, যেখানে বলা হয়েছে, এক দেশের ওপর হামলা মানে অন্য দেশের ওপর হামলা। যদি সৌদি আরব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পাকিস্তানকেও জড়াতে হতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিদ্দিকি বলেন, ‘যদি আমাদের সৌদি আরবের পাশে যুদ্ধে নামতে বলা হয়, তাহলে আমাদের পুরো পশ্চিম সীমান্ত অরক্ষিত হয়ে পড়বে।’ ইতোমধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রায় ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ রয়েছে বলে দাবি করছে। তারা অভিযোগ করে, আফগান তালেবান সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে, যা তালেবান অস্বীকার করে।
দেশীয় চাপও আছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় হত্যার পর পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে হামলার চেষ্টা করা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কয়েকজন নিহতও হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক মালিহা লোধি বলেন, ‘পাকিস্তানে জনমত ব্যাপকভাবে ইরানপন্থি।’ তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়টি নিয়ে খুবই সংবেদনশীল। এখানে পাকিস্তানের জন্য একটি বড় সুযোগও আছে। বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পেয়েছে তারা।
কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব নিয়ে সমালোচনার ব্যাপারে সংবেদনশীল। লোধি বলেন, ‘এটি উচ্চঝুঁকির কূটনীতি। সফল হলে পাকিস্তান বৈশ্বিক কূটনীতির শীর্ষে উঠে যেতে পারে।’ তবে ব্যর্থ হলেও বড় ক্ষতি হবে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ‘পাকিস্তান অন্তত আন্তরিক চেষ্টা করেছে, এটাই বড় বিষয়।’ তবে কুগেলম্যান সতর্ক করেছেন, যদি আলোচনার পরও যুদ্ধ আরও তীব্র হয়, তাহলে পাকিস্তানকে সরল বা ‘ব্যবহৃত’ হিসেবে দেখা হতে পারে।
কুগেলম্যান বলেন, ‘পাকিস্তান অপ্রচলিত কূটনৈতিক কৌশল খেলতে প্রস্তুত, ভারতের মতো নয়।’ তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা ট্রাম্পকে প্রশংসা করে ওয়াশিংটনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছেন।
তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পাকিস্তান এখন বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে। সিদ্দিকি বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে মধ্যম শক্তিগুলো একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।’ তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানকে ইরানের সঙ্গে কথা বলার জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়, কারণ তাকে প্রো-ইসরায়েলি বা অতিরিক্ত প্রো-আমেরিকান হিসেবে দেখা হয় না।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার চীনের আমন্ত্রণে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন, যেখানে তার বৈঠক হবে ওয়্যাং ই-এর সঙ্গে।
তবে সবশেষে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, পাকিস্তান কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি করাতে পারবে? কুগেলম্যানের মতে, সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অবিশ্বাস অনেক গভীর, আর দুই পক্ষের দাবিও খুব কঠোর। এই সমীকরণটাই পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।’ সূত্র: বিবিসি