মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ ইস্যুতে ইউরোপীয় নেতারা নিজেদের অবস্থানে অনড়। তারা এই যুদ্ধে জড়াতে চান না। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়ায় ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর ফলে দীর্ঘদিনের ন্যাটো জোটকে চরম চাপের মুখে ফেলেছেন তিনি। উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ এই প্রণালি সচল রাখতে ‘অবদান রাখার প্রস্তুতি’ জানালেও বৃহত্তর যুদ্ধে জড়ানোর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ট্রাম্প ইউরোপীয়দের এই সম্মিলিত বিরোধিতাকে অবজ্ঞা করেছেন। তিনি ন্যাটোকে ‘কাগজের বাঘ’ এবং এর সদস্যদেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি একটি ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘ইরান ইস্যুতে ন্যাটোর এই দুর্বল সামরিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।’
একই সঙ্গে ট্রাম্প অর্থনৈতিক পরিণতির প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছেন। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘আপনাদের নিজেদের লড়াই নিজেদের শিখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের জন্য আর থাকবে না।’
তিনি মূলত সেসব দেশের সমালোচনা করেছেন, যারা ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী সংকট নিরসনে যুক্তরাজ্য আলোচনার উদ্যোগ নেবে। তিনি মনে করেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির লাগাম টানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে চাপ সৃষ্টি করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা নিশ্চিত করা।
চাপের মুখে যুক্তরাজ্যের অবস্থানে পরিবর্তন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যৌথ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন। কিয়ার স্টারমারের যুদ্ধ সামলানোর পদ্ধতি নিয়ে ট্রাম্প বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কায় স্টারমার ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর হামলার জন্য ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধ ফিরিয়ে দেন। এতে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও মরিশাসের চুক্তির কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘আমরা উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে কাজ করছি না।’
ইরান প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করার পরপরই স্টারমার তার অবস্থানে পরিবর্তন আনেন। গত ১ মার্চ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের অংশ হিসেবে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলার জন্য চাগোস দ্বীপপুঞ্জের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ও ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। তবে ট্রাম্প এতে তুষ্ট হননি। সংঘাতের শুরুতে এই অঞ্চলে ব্রিটেনের দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
জাহাজ ও তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি বাড়লে ২০ মার্চ ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি আরও সম্প্রসারিত করা হয়। ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র জানান, বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে’ যুক্তরাজ্য। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, বৃহত্তর যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে দেশটির মূল অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
ফ্রান্স ও ইতালি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনড়
সংঘাতের শুরু থেকেই ফ্রান্স কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ খামেনিকে লক্ষ্য করে চালানো প্রাথমিক হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তবে আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্য তিনি তেহরানকেও দায়ী করেন। গত ১৭ মার্চ তিনি অঙ্গীকার করেন, হরমুজ প্রণালি খোলার অভিযানে ফ্রান্স ‘কখনোই অংশ নেবে না’। তিনি ইরানের জ্বালানি ও অবকাঠামোয় হামলা স্থগিত রাখার আহ্বান জানান।
ইসরায়েলগামী যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রবাহী বিমানকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ফ্রান্স ট্রাম্পের রোষানলে পড়ে। ট্রাম্প দেশটির ‘অসহযোগিতার’ সমালোচনা করেন। একইভাবে ইতালিও যুক্তরাষ্ট্র বোমারু বিমানকে সিসিলির সিগোনেলা ঘাঁটিতে অবতরণের অনুমতি দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কার্যালয় জানায়, প্রতিটি অনুরোধ ‘কেস-বাই-কেস’ ভিত্তিতে পরীক্ষা করা হয়। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো জানান, ১৯৫৪ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধকালে ঘাঁটি ব্যবহারের জন্য সংসদীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো বিরোধের কথা অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক চুক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন।
স্পেনের স্পষ্ট বিরোধিতার কণ্ঠস্বর
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইরানে হামলার সবচেয়ে সোচ্চার বিরোধী। গত ৪ মার্চ তিনি বলেন, ‘ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলা সম্ভব নয়।’ তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ করে সংলাপের পথে ফেরার আহ্বান জানান। মাদ্রিদ সরকার তেহরানে হামলার জন্য যৌথ ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা দিলে ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে ‘সব বাণিজ্য বন্ধ’ করার হুমকি দেন।
পরবর্তী সময় হোয়াইট হাউস দাবি করে স্পেন তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। তবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেজ তা সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি জানান, ইরানের ওপর হামলা ও ঘাঁটি ব্যবহারের বিষয়ে স্পেনের অবস্থান বিন্দুমাত্র বদলায়নি। স্পেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় রোটা ও মোরোন ঘাঁটি থেকে ১৫টি বিমান সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
জার্মানি ও আয়ারল্যাল্ডের কৌশলী দূরত্ব
জার্মান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ওয়াল্টার স্টাইনমায়ার এই সংঘাতকে ‘ভয়াবহ ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আসন্ন হামলার যুক্তি ধোপে টেকে না। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জও যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, ওয়াশিংটন এ বিষয়ে জার্মানির সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি। জার্মানি বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এড়িয়ে চলছে।
আয়ারল্যান্ড সরকার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন জানান, হরমুজ প্রণালি রক্ষার অভিযানে অংশ নেওয়ার মতো আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা আয়ারল্যান্ডের নেই। তিনি যুদ্ধের ‘শান্তিপূর্ণ সমাধান’ চান। জুলাই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের সভাপতিত্ব গ্রহণ করতে যাওয়া আয়ারল্যান্ড এই সংকটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ
ন্যাটো মিত্রদের ওপর ট্রাম্পের এই ক্রমাগত চাপ মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের অংশ। ট্রাম্প মনে করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন সামরিক ছত্রচ্ছায়ায় থেকেও সংকটের সময় দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করছে। বিশেষ করে ইরানের তেলের ওপর নির্ভরশীল অনেক ইউরোপীয় দেশের জন্য এই যুদ্ধ একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন ভাবছে যে মার্কিন সহায়তা ছাড়াই তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে স্পেন ও ফ্রান্সের কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে ইউরোপ আর অন্ধভাবে মার্কিন সমরনীতি অনুসরণ করতে রাজি নয়। জার্মানির মতো শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোও যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। তাদের মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা ছাড়া এই অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে চরমপন্থা উসকে দেবে।
ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সংকট
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ‘স্পেশাল রিলেশনশিপ’ বজায় রাখা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা–এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। চাগোস দ্বীপপুঞ্জের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে তিনি ট্রাম্পকে শান্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা হিতে বিপরীত হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি আরও বড় অংশগ্রহণ, যা ব্রিটেন এই মুহূর্তে দিতে প্রস্তুত নয়।
এ ছাড়া ইউরোপীয় নেতারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরতে নারাজ। ট্রাম্পের ভাষায় তারা ‘কাপুরুষ’ হতে পারেন। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে তারা একটি অপ্রয়োজনীয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এড়াতে সচেষ্ট। ন্যাটোর এই অভ্যন্তরীণ ফাটল কেবল সামরিক নয়। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকট। আগামী কয়েক সপ্তাহ নির্ধারণ করবে এই জোট টিকে থাকবে নাকি ট্রাম্পের চাপে ইউরোপ ও আমেরিকার পথ আলাদা হয়ে যাবে। সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, বিবিসি, দ্য হিল