পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শাহের ১৫ দফা প্রতিশ্রুতিকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, বাংলাকে (পশ্চিমবঙ্গ) যদি বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে গত দেড় বছর ধরে সে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে মোদি সরকার? এর পেছনে কোন শিল্পপতির স্বার্থ লুকিয়ে আছে, সেই জবাবও তলব করেন তিনি। পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি) এবং জাতীয় নিরাপত্তায় কেন্দ্রের ব্যর্থতা নিয়েও শাহের কড়া সমালোচনা করেন অভিষেক।
বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল শুক্রবার বাংলায় এসে বিজেপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আর সেই ইশতেহার প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতা মেট্রোপলিটনের তৃণমূল ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে শাহের প্রতিটি প্রতিশ্রুতির কড়া জবাব দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই অভিষেক আগের নির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ইশতেহারের নাম ছিল ‘সোনার বাংলা’। কিন্তু এবার সেই নাম কোথাও নেই । তার মানে কি বিজেপি ধরে নিয়েছে, বাংলা ইতোমধ্যেই সোনার বাংলায় পরিণত হয়েছে? তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের দাবি, গত কয়েক মাসে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি রাজ্যে যে প্রহসন চালিয়েছে, তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত ছিল, ইশতেহার প্রকাশের আগে বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে পরিসংখ্যান তুলে ধরে অভিষেক বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় তালিকা এবং অমীমাংসিত নাম মিলিয়ে রাজ্য থেকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশই হিন্দু বাঙালি। আসামের এনআরসি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, বিজেপি বারবার বাঙালিদের টার্গেট করেছে। আসামে ১৯ লাখের মধ্যে ১২ লাখ হিন্দু বাঙালিকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর ষড়যন্ত্র হয়েছিল। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলা ভাষায় কথা বললে বা নিজেদের পছন্দের খাবার খেলে হেনস্তার শিকার হতে হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রীর উদাহরণ টেনে অভিষেক বলেন, যারা বাঙালিদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, বিজেপি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে পুরস্কৃত করেছে।
অমিত শাহের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিজেপি প্রকাশ্যে কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে যে তারা ক্ষমতায় এলে বাংলা পরিচালিত হবে দিল্লি ও গুজরাট থেকে। শাহের ‘বাংলাদেশ’ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অভিষেকের পাল্টা প্রশ্ন, বাংলাকে যদি বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে দেড় বছর ধরে সে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মোদি সরকার কেন দিল্লিতে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে? কোন শিল্পপতিকে বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশে হিন্দু সাধুদের ওপর যখন অত্যাচার হয়েছে, তখন কেন্দ্র কী ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেই জবাবও তলব করেন অভিষেক।
অনুপ্রবেশ রুখতে বিজেপির কড়া অবস্থানের প্রতিশ্রুতির পাল্টা জবাব দেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তিনি মনে করিয়ে দেন, ১০ বছর ধরে একই কথা বলে আসছে গেরুয়া শিবির। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় কেন্দ্রের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলায় নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। খোদ রাজধানী দিল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটছে। দিল্লি পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সত্ত্বেও কেন এই ব্যর্থতা? এই প্রশ্ন তুলে অমিত শাহকে নিশানা করেন তিনি।
দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করার যে দাবি বিজেপি করেছে, তাকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন অভিষেক। তিনি বলেন, প্রায় ৭৫৭ দিন আগে তিনি আবাস যোজনা ও ১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকার শ্বেতপত্র চেয়েছিলেন, যা কেন্দ্র আজও দিতে পারেনি। অভিষেকের দাবি, ইডি-সিবিআইয়ের খাতায় নাম থাকা দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারাই এখন বিজেপিতে গিয়ে ‘ধোয়া তুলসীপাতা’ হয়ে গেছেন। শুভেন্দু অধিকারী, হিমন্ত বিশ্ব শর্মা, প্রেমা খাণ্ডু বা নারায়ণ রাণের মতো নেতাদের পাশে বসিয়ে বিজেপি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে লোক হাসানোর শামিল।
পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘভাতা এবং সপ্তম বেতন কমিশন দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি অমিত শাহ দিয়েছেন, তারও কড়া জবাব দেন তৃণমূল নেতা। তিনি জানান, গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজ্য বিধানসভায় যে বাজেট পেশ করা হয়েছে, সেখানেই সপ্তম পে-কমিশনের কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ১৯৪৬ ও ১৯৫৯ সালের পে-কমিটির ইতিহাস তুলে ধরে অভিষেক বলেন, রাজ্য সরকার ইতোমধ্যেই সেই ঘোষণা করে দিয়েছে, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানেনই না। না জেনেই তিনি প্রতিশ্রুতি বিলি করছেন বলে কটাক্ষ করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজেপির ১৫ দফা ইশতেহারে কী আছে
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপি নেতা ও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গতকাল কলকাতায় ‘সংকল্প পত্র’ নামে ১৫ দফার একটি নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। এই ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অমিত শাহের মতে, এই ইশতেহার পশ্চিমবঙ্গকে বর্তমানের নিরাশা থেকে মুক্তি দিয়ে ‘বিকশিত ভারত’-এর রোডম্যাপ অনুযায়ী নতুন দিশা দেখাবে এবং রবীন্দ্র জয়ন্তীর পুণ্যলগ্নে একটি সমৃদ্ধ বাংলা গড়ে তুলবে।
ইশতেহারে নারী ও যুবসমাজের জন্য একগুচ্ছ আর্থিক ও সামাজিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ কোটা এবং তাদের মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা করার বিষয়টি অন্যতম। বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা প্রদানের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ১৫ হাজার টাকা এবং নতুন স্টার্ট-আপ শুরুর জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে অবিবাহিত ছাত্রীদের স্নাতক স্তরে ভর্তির সময় ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের অঙ্গীকার করেছে দলটি। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ইটিভি ভারত