এখন থেকে আবারও প্রাণঘাতী অস্ত্র বহির্বিশ্বের কাছে বিক্রি করতে পারবে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মন্ত্রিসভা যুদ্ধবিমানের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর থেকে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এটি জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী সংবিধান থেকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তাকাইচি জানান, কোন কোন অস্ত্র রপ্তানি করা হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে জাপানি সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ এ তালিকায় থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু জাহাজ ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার জন্য তৈরির চুক্তি হয়েছে।
তাকাইচি বলেন, ‘এই সংশোধনের ফলে নীতিগতভাবে সব ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম স্থানান্তর সম্ভব হবে।’ তিনি যোগ করেন, অস্ত্র কেবল সেই দেশগুলোকেই দেওয়া হবে যারা জাতিসংঘ সনদের নিয়ম মেনে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেবে। বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একা কোনো দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাপানের ‘চুনিচি’ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১৭টি দেশ এই পরিবর্তনের ফলে জাপানি অস্ত্র কিনতে পারবে। ভবিষ্যতে আরও দেশ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করলে এই তালিকা বাড়তে পারে। এর আগে ১৯৬৭ সালে প্রণীত এবং ১৯৭৬ সালে কার্যকর হওয়া নীতিমালায় জাপান কেবল অ-প্রাণঘাতী সামরিক সরঞ্জাম, যেমন নজরদারি বা মাইন অপসারণে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, রপ্তানি করতে পারত।
‘আসাহি’ পত্রিকার মতে, বর্তমানে যেসব দেশে যুদ্ধ চলছে সেখানে সরাসরি অস্ত্র রপ্তানিতে এখনো সীমাবদ্ধতা থাকবে। তবে ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় ব্যতিক্রম করা হতে পারে।
জাপানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়া জাপানের তৈরি অস্ত্র কিনতে আগ্রহী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। সম্প্রতি জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি হয়েছে, যার আওতায় মিতসুবিশি ভারী শিল্প অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনীর জন্য ১১টি যুদ্ধজাহাজের মধ্যে প্রথম তিনটি নির্মাণ করবে।
অন্যদিকে এ নীতিগত পরিবর্তনের সময়ই তাকাইচি টোকিওর বিতর্কিত ইয়াসুকুনি শ্রাইনে বসন্ত উৎসব উপলক্ষে একটি ধর্মীয় উপহার পাঠিয়েছেন বলে খবর এসেছে। ১৮০০-এর দশকে নির্মিত এ মন্দিরে জাপানের যুদ্ধাহতদের স্মরণ করা হয়, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক হাজারেরও বেশি দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীর নাম রয়েছে, যার মধ্যে ১৪ জন ‘ক্লাস এ’ অপরাধীও অন্তর্ভুক্ত।
এই মন্দিরে জাপানি নেতাদের সফর বা সম্মান প্রদর্শন দীর্ঘদিন ধরে চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের কাছে সংবেদনশীল ইস্যু। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের নৃশংসতার স্মৃতি এখনো সেখানে বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে, বিশেষ করে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর, জাপান একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করে যেখানে যুদ্ধ ত্যাগের অঙ্গীকার করা হয়।
তবে তাকাইচি সেসব জাপানি নেতাদের মধ্যে রয়েছেন, যারা এই শান্তিবাদী অবস্থান থেকে সরে আসার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাকে অনেক সময় ‘চীনবিরোধী কঠোর অবস্থানের’ নেতা বা ‘আয়রন লেডি’ বলা হয়।
এদিকে জাপানের এ সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় চীন কঠোর সমালোচনা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে এবং জাপানের ‘অবিবেচনাপ্রসূত সামরিকায়নের’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। সূত্র: আলজাজিরা