২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন যত গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। রাজ্যের দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের ভিত আলগা করার পেছনে অন্যতম কারিগর হিসেবে উঠে আসছেন মুর্শিদাবাদের ‘ভূমিপুত্র’ তথা বিদ্রোহী নেতা হুমায়ুন কবীর। তার নবগঠিত দল ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলোতে তৃণমূলের চিরাচরিত ভোটব্যাংকে এমনভাবে থাবা বসিয়েছে, যা ঘাসফুল শিবিরের (তৃণমূল) জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে।
২০২৫ সালে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর হুমায়ুন কবীর যখন ১৮২টি আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন, তখন শাসক শিবিরের অনেকেই একে গুরুত্ব দিতে চাননি। কিন্তু আজকের ফলাফলের ট্রেন্ড বলছে, মুর্শিদাবাদের নওদা ও রেজিনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে হুমায়ুন কবীর নিজেই তৃণমূল প্রার্থীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নওদা কেন্দ্রে হুমায়ুন কবীর তৃণমূলের শাহিনা মমতাজ খানের চেয়ে ১০,০০০-এর বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে রেজিনগর কেন্দ্রেও হুমায়ুন কবীরের দাপটে তৃণমূলের প্রার্থী আতাউর রহমান তিন নম্বর স্থানে নেমে গিয়েছেন, সেখানে মূল লড়াই এখন হুমায়ুন বনাম বিজেপির প্রার্থীর মধ্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হুমায়ুন কবীরের কৌশলী প্রচার সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে তৃণমূল বিরোধী হাওয়া তৈরি করতে সফল হয়েছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলার সংখ্যালঘু এলাকায় হুমায়ুন নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলের ‘ভোটব্যাংক রাজনীতি’র বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, হুমায়ুনের দল মূলত সেই সব ভোট কেটেছে যা ঐতিহাসিকভাবে তৃণমূলের ঝুলিতে যেত।
দেখা যাচ্ছে, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের অন্তত ৩৫টি আসনে আম জনতা ৫ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে, যার সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে তৃণমূলের পরাজয়ে। বহু আসনে যেখানে তৃণমূলের জয় নিশ্চিত বলে ধরা হয়েছিল, সেখানে আম জনতা পার্টির উপস্থিতিতে কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে হারের মুখ দেখতে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতাদের। ভোটের দিন নওদা এবং রেজিনগরে তৃণমূল ও হুমায়ুন সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যা সাধারণ ভোটারদের এক বড় অংশকে শাসক দলের থেকে বিমুখ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূলের এই ভোট কমার সুফল সরাসরি ভোগ করছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি যখন রাজ্যে ম্যাজিক ফিগারের দিকে এগোচ্ছে, তখন মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো সংখ্যালঘু প্রভাবিত এলাকায় তৃণমূলের ভোট কাটাকাটি গেরুয়া শিবিরের পথ প্রশস্ত করেছে। তৃণমূলের সংসদ সদস্য আবু তাহের খানও ঘরোয়া আলোচনায় স্বীকার করেছেন, হুমায়ুনের এই ‘ভোট কাটুয়া’ ভূমিকা আদতে বিরোধী শিবিরকেই অক্সিজেন দিয়েছে। তৃণমূল এখন কার্যত ব্যাকফুটে, কারণ গ্রাম বাংলার যে 'ভোট ব্যাংক' তাদের প্রধান শক্তি ছিল, সেখানে হুমায়ুনের মতো নেতার বিদ্রোহ ফাটল ধরিয়েছে। হুমায়ুন কবীর ইতিপূর্বেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তার দল কেবল ভোট কাটতেই আসেনি, বরং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ‘নির্ণায়ক শক্তি’ বা কিং-মেকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া