ইয়েমেনের বন্দরনগরী মুকাল্লার পূর্ব উপকণ্ঠ থেকে শহরের কেন্দ্রে যাত্রী পরিবহন করেন ৫৫ বছর বয়সী আব্দুল্লাহ সালেম। একদিন নিয়মিত ভাড়ায় ১০০ ইয়েমেনি রিয়াল (প্রায় ৬ সেন্ট) বাড়ানোর পরই যাত্রীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি।
আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘তারা আমার ওপর চিৎকার করছিল। আমি বললাম, এটা আমার সিদ্ধান্ত নয়; সরকারই জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে।’ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি (ওয়াইপিসি) সম্প্রতি জ্বালানির দাম আবারও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক সংকটকে গভীর করবে।
গত ১৬ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানায়, পেট্রল ও ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১ হাজার ১৯০ ইয়েমেনি রিয়াল থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৭৫ রিয়াল করা হয়েছে, যা প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি।
ওয়াইপিসি বলেছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং ইয়েমেনে জ্বালানি পরিবহন ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি করতে হয়েছে।
একই পোস্টে কোম্পানিটি জনগণের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করে জানায়, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং উপসাগরীয় সংকট শেষ হলে দাম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। তবে বৈশ্বিক বাজারে কখনো কখনো তেলের দাম কমলেও ওয়াইপিসি তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে। কোম্পানির দাবি, তারা পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে, যার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যয়ও স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলে।
‘কিছুই সঞ্চয় করতে পারি না’
আবদুল্লাহ সালেমের মতো লাখো ইয়েমেনির জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন এক ধাক্কা। তিনি সকালে মুখাল্লার বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন, আর বিকেলে সাধারণ যাত্রী পরিবহন করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় কাজ করেও জ্বালানির খরচ মিটিয়ে নিজের ও ভাইয়ের পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই সঞ্চয় করতে পারি না। খাবারসহ সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে।’ খরচ সামাল দিতে তিনি শিক্ষার্থীদের মাসিক ভাড়া ৩ হাজার রিয়াল বাড়িয়েছেন এবং বিকেলের যাত্রাপ্রতি ভাড়া ১০০ রিয়াল বাড়িয়েছেন। শিক্ষার্থীরা তা মেনে নিলেও সাধারণ যাত্রীদের অনেকে এখন তার গাড়িতে ওঠা বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা এখন লিফট নিয়ে চলাচল করছেন। আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা চাই সরকার ভর্তুকিযুক্ত জ্বালানি দিক। মানুষ খুবই দরিদ্র, আর এই দাম বাড়লে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়বে।’
এখনো খাদ্যের দামে তাৎক্ষণিক বড় বৃদ্ধি দেখা না গেলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে পড়বে এবং খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। তারা আশঙ্কা করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়লে সরকার আবারও জ্বালানির দাম বাড়াতে পারে।
স্টাডিজ অ্যান্ড ইকোনমিকস মিডিয়া সেন্টারের এক কর্মকর্তা বলেন, ইয়েমেন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি করে। পাশাপাশি স্থানীয় তেলক্ষেত্র থেকেও কিছু জ্বালানি দেশীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়।
তিনি বলেন, ‘বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি কিংবা জ্বালানি সংকট, সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেই এর প্রভাব পড়তে পারে। ইয়েমেনের মতো দুর্বল অর্থনীতি বাইরের ধাক্কায় খুব সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে
সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পর সরকার-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে অ্যাডেন ও মুখাল্লায় পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পরিবহন ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অনেকের মতে, এটি ছিল জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা, যাতে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
আগের কয়েক দফা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সময় সহিংস বিক্ষোভ দেখা গেলেও এবার সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বড় ধরনের অস্থিরতার খবর পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আম ফাতেমিয়া প্রতিদিন মুখাল্লায় বাড়ি থেকে ক্যাম্পাসে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় নেন। তিনি জানান, তার পরিবারের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এমনকি তার পড়াশোনার খরচ চালাতে মা নিজের গয়নাও বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি, অথচ কেউ আমাকে সাহায্য করেনি।’ সূত্র: রয়টার্স