ইউক্রেনের হামলার আশঙ্কার কারণে গতকাল শনিবার রাশিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সীমিত পরিসরের বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত ইউক্রেন যুদ্ধ চার বছরের বেশি সময় পার করলেও মস্কোর জন্য এখনো সুস্পষ্ট বিজয় অধরাই রয়ে গেছে।
৯ মে মস্কোর রেড স্কয়ারে আয়োজিত এই কুচকাওয়াজ রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসগুলোর একটি। দিনটি সোভিয়েত ইউনিয়নের নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয় উদ্যাপন এবং যুদ্ধে নিহত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ সোভিয়েত নাগরিকের স্মরণে পালন করা হয়, যাদের মধ্যে বহু ইউক্রেনীয়ও ছিলেন।
একসময় রাশিয়ার সামরিক শক্তির প্রদর্শনী হিসেবে ব্যবহৃত এই কুচকাওয়াজে আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ভারী অস্ত্র প্রদর্শন করা হতো। তবে এবার রেড স্কয়ারে কোনো ট্যাংক বা ভারী সামরিক সরঞ্জাম দেখা যায়নি। সৈনিক ও নাবিকরা, যাদের অনেকেই ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, মার্চ করে এগিয়ে যান। তাদের অভিবাদন গ্রহণ করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি ভ্লাদিমির লেনিনের সমাধিসৌধের পাশে রুশ যুদ্ধপ্রবীণদের সঙ্গে বসে অনুষ্ঠান দেখেন।
ক্রেমলিনের সহকারী ইউরি উশাকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাধারণভাবে সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন ছাড়া।’ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের বিরুদ্ধে একতরফা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তিন দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে মস্কো ও কিয়েভ উভয়ই। একই সঙ্গে দুই পক্ষ ১ হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই এটি থেমে যাক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রাণহানির দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। প্রতি মাসে ২৫ হাজার তরুণ সেনা মারা যাচ্ছে। এটা পাগলামি।’
তিনি আরও বলেন, তিনি যুদ্ধবিরতি ‘আরও দীর্ঘায়িত’ হতে দেখতে চান। গতকাল শনিবার পর্যন্ত মস্কো বা কিয়েভ, কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেনি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করা রাশিয়া আগেই সতর্ক করেছিল, কিয়েভ যদি শনিবারের অনুষ্ঠানে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে, তাহলে ইউক্রেনের রাজধানীতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হবে। মস্কো বিদেশি কূটনীতিকদেরও জানিয়েছিল, এমন পরিস্থিতিতে তারা যেন কিয়েভে থাকা কর্মীদের সরিয়ে নেয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে একটি আদেশ জারি করে বলেন, রাশিয়ার ৯ মে’র সামরিক কুচকাওয়াজ ‘অনুমোদিত’ এবং ইউক্রেনীয় অস্ত্র রেড স্কয়ারকে লক্ষ্য করবে না। মস্কোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর। রয়টার্সের ছবিতে দেখা যায়, পিকআপ ট্রাকের ওপর সশস্ত্র সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকার বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আশপাশের অঞ্চলসহ মস্কো মহানগরীতে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস।
১৯৪১ সালে নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ চালানোর পর রেড আর্মি পাল্টা অভিযান চালিয়ে বার্লিন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখানে নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার আত্মহত্যা করেন এবং ১৯৪৫ সালের মে মাসে রাইখস্টাগ ভবনের ওপর সোভিয়েত বিজয়ের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
নাৎসি জার্মানির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ কার্যকর হয় ১৯৪৫ সালের ৮ মে রাত ১১টা ১ মিনিটে, যা ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে ‘ভিক্টরি ইন ইউরোপ ডে’ হিসেবে পালিত হয়। তবে মস্কোয় তখন ইতোমধ্যে ৯ মে শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকেই দিনটি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে রাশিয়ায় ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
তবে এবারের কুচকাওয়াজ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে মস্কোয় উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধটিতে এখন পর্যন্ত লাখো মানুষ নিহত হয়েছেন, ইউক্রেনের বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং রাশিয়ার প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কও শীতল যুদ্ধের পর সবচেয়ে অবনতির পর্যায়ে নেমে গেছে।
যুদ্ধপন্থি রুশ জাতীয়তাবাদী এবং বর্তমানে কারাবন্দি ইগর গিরকিন মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে লেখেন, ‘সংকট ধীরে ধীরে আরও গভীর হচ্ছে। কিন্তু কোনো আকস্মিক পদক্ষেপ পুরো অর্থনীতিকে, এমনকি শুধু অর্থনীতিই নয়, ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।’
সাবেক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইগর গিরকিন নৌবাহিনীর উদাহরণ টেনে বলেন, রাশিয়ার নেতারা জাহাজডুবির চেয়ে নিজেদের কেবিন হারানোর ভয়েই বেশি চিন্তিত। এদিকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ পশ্চিমা গণমাধ্যম, বিশেষ করে সিএনএনের সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেখানে বলা হয়েছিল অভ্যুত্থান বা হত্যাচেষ্টার আশঙ্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
রুশ কর্মকর্তারা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার খবরকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ইউরোপের একটি অজ্ঞাত গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে জানায়, রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুকে সম্ভাব্য অভ্যুত্থান নেতাদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শনিবারের কুচকাওয়াজে সের্গেই শোইগুকে পুতিনের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে। সূত্র: রয়টার্স