যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চলতি সপ্তাহের চীন সফরকে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষা নতুনভাবে নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের আগে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে প্রযুক্তি, বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও তাইওয়ান ইস্যুসহ নানা জটিল উত্তেজনা সামাল দিতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ, যা পুরো সফরের ওপর বড় ছায়া ফেলেছে।
২০১৭ সালে ট্রাম্পের সফরের পর এটিই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। তবে এবারকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে ট্রাম্প ও শি এমন এক ক্রমবিভক্ত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দুই পাশে অবস্থান করছেন, যেখানে চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার ইরান এখনো ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতির চাপ প্রত্যাখ্যান করছে।
অন্যদিকে চীনও বদলে গেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধের ধাক্কা সামলে বেইজিং এখন নিজেদের রপ্তানি শক্তিকে আরও উন্নত করেছে এবং উচ্চপ্রযুক্তির বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প এমন এক নেতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যিনি চীনের নির্ধারিত মেয়াদসীমা অতিক্রম করে নিজের ক্ষমতা আরও শক্ত করেছেন। অন্যদিকে শি জিনপিং এমন এক মার্কিন নেতার সঙ্গে বৈঠক করছেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছেন এবং আইন অনুযায়ী নিজের শেষ মেয়াদে আছেন।
দুই নেতার এই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকে ট্রাম্পের পছন্দের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনও থাকবে, যেমন বেইজিংয়ের টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও কৌশলগত আচরণ শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নয়, বরং দুই দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের ওপরও বড় প্রভাব ফেলবে।
ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি
ট্রাম্পের জন্য এটি হয়তো তার কল্পিত সফর নয়, তবে বাস্তবতা তাকে এই সফরে অংশ নিতে বাধ্য করেছে। গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মাধ্যমে দুই নেতার মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমেছিল। সেখানে বড় বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক ছাড় নিয়ে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়।
মার্চে আরেকটি শীর্ষ বৈঠকের পরিকল্পনা ছিল, যেখানে অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা মূল আলোচ্য হওয়ার কথা ছিল। যদিও নতুন বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এখনো চলছে, ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের কৌশলকে জটিল করে তুলেছে।
ইরান যুদ্ধ যাতে সফরকে পুরোপুরি ছাপিয়ে না যায়, সে জন্য ট্রাম্প চীন সফর পিছিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু এখন যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়িয়েছে এবং এখনো শান্তিচুক্তির কোনো লক্ষণ নেই। সোমবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতি এখন ‘ম্যাসিভ লাইফ সাপোর্টে’ আছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে প্রশ্ন উঠছে, ইরান যুদ্ধে জড়িত অবস্থায় ট্রাম্প আদৌ নিজের কাঙ্ক্ষিত ফল পাবেন কি না। একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার অন্য দায়িত্বগুলো পালন করবেন না কেন?’ তবে ধারণা করা হচ্ছে, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ইরান।
মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান নিয়ে ‘দীর্ঘ আলোচনা’ করবেন। হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় সিএনএনের সাংবাদিক আলাইনা ট্রিনকে ট্রাম্প বলেন, ‘সত্যি বলতে, তিনি (শি) তুলনামূলকভাবে ভালো আচরণ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি অবরোধের বিষয়টা দেখুন, কোনো সমস্যা হয়নি। ওই অঞ্চল থেকেই তারা অনেক তেল নেয়। আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি আমার বন্ধু।’
তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে চীনের ওপর, কারণ ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশ চীন। একই সঙ্গে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশও এর প্রভাব অনুভব করছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের কয়েক দিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বেইজিং সফর করেন, যা দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে।
এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী চীন ইরানকে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যদিও চীন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প শিকে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এবং একটি গ্রহণযোগ্য শান্তিচুক্তিতে সম্মত করানোর আহ্বান জানাবেন। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি আশা করি প্রেসিডেন্ট চাপ প্রয়োগ করবেন।’
সফরের আগের দিনই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়, যাদের বিরুদ্ধে চীনে ইরানি তেল বিক্রি ও পরিবহনে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তবে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, ট্রাম্প এমন এক বৈঠকে যাচ্ছেন যেখানে বেশির ভাগ কৌশলগত সুবিধা শি জিনপিংয়ের হাতে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে চীন এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
গত সোমবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার চেয়ে তিনি সম্ভবত তাইওয়ান প্রসঙ্গ বেশি তুলবেন।’ মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, শি হয়তো তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সহায়তা কমানোর চেষ্টা করবেন।
তবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছি না।’ ওয়ান চায়না নীতির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে বেইজিংয়ের অবস্থান স্বীকার করলেও দ্বীপটির ওপর চীনের সার্বভৌম দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে।
বাণিজ্যও আলোচ্যসূচিতে থাকবে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প ও শি মহাকাশ, কৃষি ও জ্বালানি খাতে কয়েকটি চুক্তি ঘোষণা করতে পারেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য বোর্ড ও বিনিয়োগ বোর্ড গঠনের বিষয়েও আলোচনা করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ উন্নত এআই প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প হংকংয়ের সাবেক গণমাধ্যম মালিক জিমি লাই এবং চীনের ধর্মীয় নেতা এজরা জিনের বিষয়ও তুলতে পারেন বলে জানিয়েছেন।
চীনের দৃষ্টিভঙ্গি
চীনের দৃষ্টিতে এই বৈঠকে তাদের অবস্থান শক্তিশালী। বেইজিং মনে করছে, ইরান যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন তাদের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে।
চীনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো দক্ষিণ কোরিয়ায় হওয়া বাণিজ্য সমঝোতা টিকিয়ে রাখা। তবে নিজেদের বিশাল বাজার ও বিরল খনিজ সরবরাহে আধিপত্য ব্যবহার করে তারা আরও বড় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবে।
এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপ্রযুক্তি রপ্তানির সীমাবদ্ধতা শিথিলের দাবি। চীন চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান নীতিতে পরিবর্তন এনে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিক এবং দ্বীপটিতে অস্ত্র বিক্রি কমাক।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাসহ চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য মার্কিন বাজারে আরও প্রবেশাধিকারও চায় বেইজিং। চীনে অনেকের ধারণা, ট্রাম্প মার্কিন ভোটারদের সামনে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে আগ্রহী, যেমন চীনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য ও বোয়িং বিমান কেনা। আর এটিই বেইজিংয়ের জন্য বাড়তি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই সফরের মাধ্যমে দুই পরাশক্তির সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়, তাহলে বেইজিং সেটিকেই বড় সাফল্য হিসেবে দেখবে। সূত্র: সিএনএন