গাড়ি এক সময় ছিল স্বাধীনতার প্রতীক। মা-বাবার নজরদারি থেকে দূরে নিজস্ব সিদ্ধান্ত আর সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণের এক মাধ্যম। কিন্তু দিন বদলেছে। আধুনিক গাড়িগুলো এখন মূলত ‘চাকার ওপর সচল কম্পিউটার’। বিশাল বিশাল করপোরেশন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনার জীবনের অতি ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করছে। সেগুলো দিয়ে মুনাফা কামাচ্ছে তারা। বর্তমানে ড্রাইভিং মানেই নির্জনতা বা স্বাধীনতা নয়, বরং এটি আপনার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাড়ি নির্মাতাদের নিজস্ব প্রাইভেসি পলিসি বা গোপনীয়তার নীতিগুলো একটু খুঁটিয়ে পড়লেই দেখা যায় তারা কী পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করছে। আপনার সুনির্দিষ্ট অবস্থান থেকে শুরু করে গাড়িতে কে আছে, রেডিওতে কী শুনছেন, সিটবেল্ট পরেছেন কি না, গাড়ির গতিবেগ বা হার্ড ব্রেক করার তথ্য–সবই তাদের নখদর্পণে। এমনকি আপনার বয়স, জাতিগত পরিচয়, ওজন ও মুখের অভিব্যক্তির মতো সংবেদনশীল তথ্যও বাদ যাচ্ছে না। অনেক গাড়ির ভেতরে ড্রাইভারের দিকে মুখ করে ক্যামেরা বসানো থাকে এবং ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে এসব তথ্য ড্রাইভারের অগোচরেই পাচার হয়ে যায়।
কেবল গোপনীয়তার সমস্যা নয়, আপনার পকেটেও টান দিচ্ছে। বিমা কোম্পানিগুলো এই ডেটার বড় গ্রাহক। তারা এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি প্রিমিয়াম আদায় করছে। ডেটা ব্রোকারদের কাছে এই তথ্য বিক্রির মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের এক নিখুঁত চিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
তথ্যের মহাসড়ক
বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো ও প্রভাবশালী ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২১ সালে রাস্তায় থাকা ৫০ শতাংশ গাড়ি ইন্টারনেটে যুক্ত ছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৯৫ শতাংশে পৌঁছাবে। যখনই আপনি গাড়ির ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে ফোন যুক্ত করেন বা নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করেন, তখনই আপনার গোপনীয়তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ইন্টারনেট সেবামূলক প্রতিষ্ঠান মজিলার ২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণে ২৫টি ব্র্যান্ডের গাড়ির গোপনীয়তার নীতি পর্যালোচনা করে। দেখা গেছে, প্রতিটি ব্র্যান্ডই গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মানদণ্ডে ব্যর্থ। মজিলা গাড়িকে ‘গোপনীয়তার জন্য সব থেকে খারাপ পণ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, কিয়ার (দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বহুজাতিক গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান) প্রাইভেসি পলিসিতে, এমনকি চালকের যৌন জীবন বা সাধারণ স্বাস্থ্যের তথ্য সংগ্রহের কথাও উল্লেখ আছে। যদিও কিয়া কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তারা এমন তথ্য সংগ্রহ করে না। তবে তারা এটি কেন তাদের পলিসিতে রেখেছে বা কী ধরনের সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।
মজিলার তথ্যমতে, ১৯টি গাড়ি কোম্পানি আপনার তথ্য বিক্রি করার অধিকার সংরক্ষণ করে। সম্প্রতি জেনারেল মোটরস (জিএম), হোন্ডা এবং হুন্ডাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো সম্মতি ছাড়াই চালকের অবস্থানের তথ্য বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেক সময় ওয়ারেন্ট ছাড়াই এই তথ্য কিনে নিতে পারে।
পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে
পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। জেনারেল মোটরস ‘লেক্সিসনেক্সিস’ নামের এক ডেটা ব্রোকারের কাছে চালকদের তথ্য বিক্রি করেছিল। এক চালক তার তথ্যের কপি সংগ্রহ করে দেখেন যে, সেখানে ১৩০ পৃষ্ঠার তথ্য রয়েছে। সেসব তথ্যে তার ছয় মাসের প্রতিটি যাত্রার বিবরণ ছিল। এর ফলে তার বিমা খরচ ২১ শতাংশ বেড়ে যায়।
আমেরিকার নতুন ফেডারেল আইন অনুযায়ী, গাড়িগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ইনফ্রারেড বায়োমেট্রিক ক্যামেরা ও অন্যান্য সিস্টেম বসাতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো ড্রাইভার মদ্যপ কি না বা ক্লান্ত কি না, তা শনাক্ত করা। কিন্তু আইনটি এই বিশাল পরিমাণ তথ্যের সুরক্ষা বা ব্যবহারের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের মতো অতি গোপনীয় তথ্য এখন অটোমোবাইল কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে।
নজরদারি
গাড়ি কোম্পানিগুলো দাবি করে যে তারা গ্রাহকের সম্মতি নিয়েই ট্র্যাকিং করে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম সেটআপ করার সময় না পড়েই শত শত পৃষ্ঠার শর্তে সম্মতি দিয়ে দেয়। ইউরোপের দেশগুলোতে ডেটা সুরক্ষায় কিছু কঠোর আইন থাকলেও আমেরিকা বা অন্যান্য অনেক দেশে জাতীয় পর্যায়ের কোনো শক্তিশালী আইন নেই। ফলে কোম্পানিগুলো অনেকটা দায়মুক্তভাবেই এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন বিমা কোম্পানির ‘টেলিম্যাটিক্স’ প্রোগ্রামে যুক্ত না হওয়া। মেরিল্যান্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে বিমা খরচ কমার চেয়ে বাড়ার বা অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা বেশি। গাড়ির ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম ও অ্যাপের সেটিংস থেকে গোপনীয়তা বা ডেটা শেয়ারিং অপশনগুলো বন্ধ রাখা। যেসব দেশে সুযোগ আছে, সেখানে কোম্পানিগুলোর কাছে নিজের তথ্যের কপি চাওয়া বা তথ্য মুছে ফেলার অনুরোধ করা।
গোপনীয়তা, বিশ্লেষকদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তথ্যের ওপর মানুষের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কোম্পানিগুলো অনুমতি নিতে বাধ্য হবে, ততক্ষণ এই পরিস্থিতি কেবল খারাপের দিকেই যাবে। সূত্র: বিবিসি