যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র হয়ে ওঠে গতকাল শনিবার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে সম্ভাব্য হামলা।
এই নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাড়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে একটি অশুভ ইঙ্গিতপূর্ণ এআই-নির্মিত ছবি শেয়ার করেন, যার ক্যাপশন ছিল ‘ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা’।
ছবিতে ট্রাম্পকে এক মার্কিন নৌবাহিনীর অ্যাডমিরালের সঙ্গে উত্তাল সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়, যেখানে ইরানের পতাকাবাহী একটি যুদ্ধজাহাজসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ ছিল।
পরে ট্রাম্প আরেকটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে একটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারকে একটি ইরানি বিমান ভূপাতিত করতে দেখা যায় বলে মনে হয়।
এতে কূটনৈতিক অচলাবস্থার কয়েক সপ্তাহ পর আবারও সামরিক পদক্ষেপের জল্পনা বাড়তে থাকে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ের কার্যক্রম চালাচ্ছে। আলোচনায় যে পরিকল্পনাটি গুরুত্ব পাচ্ছে, কিছু কর্মকর্তা সেটিকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি ২.০’ বলে উল্লেখ করছেন।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক অবকাঠামোর ওপর বিস্তৃত বোমা হামলা, ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম স্থাপনায় অভিযান এবং খার্গ দ্বীপে সম্ভাব্য হামলা।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতে, আলোচনাধীন একটি পরিকল্পনায় ইরানের ভেতরে কমান্ডো মোতায়েন করে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনার নিচে লুকিয়ে রাখা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করার কথা রয়েছে।
সামরিক কর্মকর্তারা পত্রিকাটিকে জানান, এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং এলাকা নিরাপদ রাখতে ও সম্ভাব্য ইরানি স্থলবাহিনীর মোকাবিলায় হাজারো সেনার সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
ইরানের তেল রপ্তানির মেরুদণ্ড
ইরানের দক্ষিণ উপকূলের অদূরে আরব উপসাগরে অবস্থিত খার্গ দ্বীপকে দেশটির তেল রপ্তানির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বীপটিতে হামলা হলে তেহরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং চীনের সমর্থনে চলা আলোচনার ভেঙে পড়ার পর। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল নাজুক যুদ্ধবিরতিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার বিষয়সহ বৃহত্তর চুক্তিতে রূপ দেওয়া।
তবে তেহরানের সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে অস্বীকৃতি এবং কৌশলগত এই জলপথের যুদ্ধকালীন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধের কারণে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
চ্যানেল ১২-কে উদ্ধৃত করে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ইসরায়েল এখন ‘কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ’ পর্যন্ত নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমেরিকানরা বুঝতে পারছে যে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা কোনো ফল দিচ্ছে না।’
শুক্রবার চীন সফর শেষে ফেরার পর ট্রাম্প নিজেও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। যদিও তিনি স্থায়ীভাবে বন্ধের পরিবর্তে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেন, তবুও তিনি তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন।
প্রতিশোধ
এদিকে, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার জেরে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গ্যাস স্টেশনগুলোর জ্বালানি সংরক্ষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সাইবার হামলার পেছনে ইরান থাকতে পারে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যাকাররা জ্বালানির মজুত দেখানো ডিসপ্লে সিস্টেমে কারসাজি করেছিল, যদিও এতে কোনো বাস্তব ক্ষতি হয়নি।
একই সময়ে, ওয়াশিংটন উপসাগরীয় অঞ্চলে চাপ বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করেছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের জন্য ইরানকে কোনো অর্থ বা ট্রানজিট ফি দিলে তা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতার মুখে, অঞ্চলজুড়ে সামরিক সম্পদের পুনর্বিন্যাস এবং উভয় পক্ষের ক্রমবর্ধমান আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কারণে আশঙ্কা বাড়ছে যে সংঘাতের এই অস্বস্তিকর বিরতি হয়তো সাময়িক ছিল- আরও একটি ঝড়ের আগের শান্ত অবস্থা। সূত্র: গালফ নিউজ
অমিয়/