বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দূরত্বে কোয়ান্টাম যোগাযোগ প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। একটি মাইক্রোস্যাটেলাইটের মাধ্যমে ১২,৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে কোয়ান্টাম এনক্রিপ্টেড ডেটা আদান-প্রদান করা হয়েছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের পথ আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
২০২৪ সালের অক্টোবরে চীনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষক জিয়ানওয়ে পান-এর নেতৃত্বে এই যুগান্তকারী পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত ‘জিনান-১’ (Jinan-1) স্যাটেলাইটটির ওজন মাত্র ২৩ কেজি, যা আগের কোয়ান্টাম স্যাটেলাইটের তুলনায় ১০ গুণ হালকা। মহাকাশে উৎক্ষেপণের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের গবেষক লরেন্ট ডি ফোর্জেস ডি পার্নি বলেন, ‘ছোট আকৃতির কোয়ান্টাম স্যাটেলাইটগুলো এক সঙ্গে অনেক সংখ্যায় উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। ঠিক যেমন স্পেসএক্স তাদের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ব্যবহার করে ইন্টারনেট সংযোগ দিচ্ছে।’
কোয়ান্টাম প্রযুক্তির প্রয়োগ
এই পরীক্ষায় ফোটনের কোয়ান্টাম স্টেট ব্যবহার করে এনক্রিপ্ট ও ডিক্রিপ্ট-কী তৈরি করা হয়, যা নিরাপদ যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। গবেষকরা চীনের মহাপ্রাচীর ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেলেনবোশ ইউনিভার্সিটির ছবি এনকোড করেন। এর পর লেজার ও টেলিস্কোপের মাধ্যমে জিনান-১ স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন গ্রাউন্ড স্টেশনের মধ্যে ছবিগুলো প্রেরণ করা হয়। গবেষক দলটি ২০ বার এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দূরত্বে ডেটা বিনিময় করা সম্ভব হয়েছে।
তবে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষক আলেকজান্ডার লিং বলেন, ‘জিনান-১ কেবল এনক্রিপশন-কী ডিস্ট্রিবিউশন প্রযুক্তির জন্য উপযোগী, এটি কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন বা এনট্যাঙ্গেলমেন্ট ডিস্ট্রিবিউশন করতে পারবে না।’ এর পরও লিং এটির প্রশংসা করে বলেন, আগামী দশকের মধ্যে এটি বাস্তব যোগাযোগ নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে।
ডি ফোর্জেস ডি পার্নি বলেন, ‘কোয়ান্টাম-কী ডিস্ট্রিবিউশন প্রযুক্তিকে প্রথম কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন ব্যবহারের ঘটনা ও কোয়ান্টাম ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চীনের এই সাফল্য কোয়ান্টাম ইন্টারনেটের দ্বিতীয় প্রজন্মের স্যাটেলাইট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
‘জিনান-১’ মূলত ২০২২ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে চীন আরও দুই থেকে তিনটি কোয়ান্টাম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের কোয়ান্টাম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির তত্ত্বাবধানে থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কোম্পানি বোয়িংও এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।


