ব্রিটিশ মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সারে স্যাটেলাইট টেকনোলজি লিমিটেড (এসএসটিএল) একটি বড় আকারের বেসরকারি মহাকাশ টেলিস্কোপ তৈরির কাজ হাতে নিয়েছে। সাধারণত ছোট স্যাটেলাইট তৈরির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি থাকলেও এবার তারা হাবল টেলিস্কোপের চেয়েও বড় আয়নার একটি টেলিস্কোপের কাঠামো তৈরি করবে। ৯ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরিক স্মিট ও তার স্ত্রী ওয়েন্ডি স্মিটের প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থা ‘স্মিট সায়েন্সেস’ এই প্রকল্পের অর্থায়ন করছে। এই মহাকাশ টেলিস্কোপটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘লাজুলি’। এটি মূলত ‘এরিক অ্যান্ড ওয়েন্ডি স্মিট অবজারভেটরি সিস্টেম’-এর একটি অংশ। এই প্রকল্পের আওতায় মহাকাশে একটি টেলিস্কোপ ছাড়াও পৃথিবীতে তিনটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থাকবে।
এসএসটিএল এই টেলিস্কোপের মূল মহাকাশযান প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। এই প্ল্যাটফর্ম টেলিস্কোপের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ (অ্যাটিচিউড কন্ট্রোল), প্রপালশন বা ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা এবং পৃথিবী ও মহাকাশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার কাজ করবে। বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে এটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। লাজুলি টেলিস্কোপে তিন মিটার চওড়া একটি প্রাথমিক আয়না থাকবে, যা নাসার বিখ্যাত হাবল টেলিস্কোপের আয়নার চেয়েও বড়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সে অনুষ্ঠিত আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির এক সভায় স্মিট সায়েন্সেস প্রথম এই প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। সেই সময় তারা জানিয়েছিল যে, টেলিস্কোপের যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। তবে তখন কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি। এখন এসএসটিএলের নাম প্রকাশের মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি সামনে এল।
চল্লিশ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান এসএসটিএল মূলত ছোট স্যাটেলাইট বিপ্লবের পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত। যখন বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিশাল আকৃতির মহাকাশযান তৈরিতে ব্যস্ত ছিল, তখন এসএসটিএল ছোট ও সাশ্রয়ী স্যাটেলাইটের ধারণা জনপ্রিয় করে তোলে। গত চার দশকে তারা পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, নৌ-চলাচল এবং যোগাযোগসহ বিভিন্ন কাজে ৭০টিরও বেশি মহাকাশযান সফলভাবে তৈরি ও উৎক্ষেপণ করেছে।
ছোট স্যাটেলাইট তৈরির অভিজ্ঞতা কীভাবে বিশাল এই টেলিস্কোপ তৈরিতে কাজে লাগবে, সে বিষয়ে এসএসটিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান্ড্রু ক থর্ন একটি বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, এসএসটিএল ছোট স্যাটেলাইটের জন্য পরিচিত হলেও তাদের কাজের ধরনটিই আসলে ছোট বা সুশৃঙ্খল, মহাকাশযানের আকার নয়। তারা প্রমাণ করতে চান যে, দ্রুত উন্নয়ন পদ্ধতি এবং সাধারণ বাণিজ্যিক প্রযুক্তির বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারের মাধ্যমে বড় এবং উচ্চাভিলাষী মহাকাশ মিশনও সফল করা সম্ভব।
স্মিট সায়েন্সেস জানিয়েছে, এই টেলিস্কোপ তৈরির খরচ কমানোর জন্য তারা প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে কাজ করছে। এর চূড়ান্ত সংযোজন করা হবে ফ্লোরিডার উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের কাছেই। এ ছাড়া টেলিস্কোপে এমন সব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হবে যা আগে অন্য মহাকাশ মিশনে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও এই প্রকল্পের সঠিক বাজেট জানানো হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে এর খরচ হবে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার। এটি নাসার সমমানের বড় কোনো মিশনের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ খরচ।
মহাকাশ গবেষণা খাতে বেসরকারি উদ্যোগের এই জয়যাত্রাকে বড় একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে এরিক স্মিটের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা যখন ব্যক্তিগত তহবিল দিয়ে হাবলের চেয়ে বড় টেলিস্কোপ বানাচ্ছেন, তখন মহাকাশ বিজ্ঞানে গবেষণার সুযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। লাজুলি মহাকাশে গেলে তা মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
/আবরার জাহিন


