জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি হায়েনাদের আক্রমণ থেকে দেশকে মুক্ত করতে স্বাধীনতার ডাক দিলেন। জেনে আমার ভেতরে রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছিল। আমি তখন ছিলাম নিতান্ত কিশোর, দশম শ্রেণির ছাত্র। ছুটে গেলাম এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। তারা আমাকে নিষেধ করলেন। আমি তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করব, দৃঢ়কণ্ঠে জানাই। পীড়াপীড়িতে অবশেষে তাদের দল আমাকে সঙ্গে নিতে রাজি হলো।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার বাসিন্দা ক্যাপ্টেন বাবু মান্নান ভাই আমাদের কমান্ডার ছিলেন। আমি নেত্রকোনা জেলার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা বিসরপাশা বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে যোগদান করি। ময়মনসিংহ ইপিআরের সদস্যদের সঙ্গে আমি ক্যাপ্টেন বাবুর নেতৃত্বে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে প্রশিক্ষণ নিই। তখন অস্ত্রচালনা ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখানো হয় আমাদের।
আমার এখন বয়স হয়েছে। অনেকটা অসুস্থও। তাই একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত কাহিনি আজ ভুলে যেতে বসেছি। তবে ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনা এখনো অমলিন। সেই যুদ্ধের কিছু ভয়াবহ স্মৃতি আমি ভুলতে পারি না। যখন একা থাকি, তখন সেই স্মৃতিগুলো কতবার যে মনে পড়ে তার কোনো হিসাব নেই।
একাত্তরের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা থানা তখন পাকিস্তানি সেনাদের দখলে। বিকেলে গোপনে এক আলোচনা সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যে করেই হোক ধর্মপাশা থানাকে হায়েনামুক্ত করতে হবে। ৪০-৫০ জনের একটি দল অস্ত্র নিয়ে ছুটে গেলাম থানার সামনে। পাকিস্তানি সেনাদের ছিল ২০-৩০ জনের দল। শুরু হলো অন্ধকারে তুমুল সম্মুখযুদ্ধ, গোলাগুলি। আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে ওরা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। ওরা প্রাণভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে পালাল। ওরা কয়েকজন আহত হয়েছে। আহত অবস্থায় দৌড়ে আত্মরক্ষা করতে ছুটে পালিয়ে গেল হানাদাররা।
ধর্মপাশা থানাকে হায়েনামুক্ত করার পর বংশীকুণ্ডা রোডে কালভার্ট ভাঙতে পরবর্তী অপারেশনের কাজ শুরু হয়েছে। আমরা কালভার্ট ভাঙছিলাম। হঠাৎ নিজেদের দলের একজনের গ্ৰেনেড চার্জের সময় ভুলের কারণে আমার ডান হাতে লেগে যায়। স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে দুই সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা নিই। তারপর আবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। দীর্ঘদিন পর এখনো হাতটা অবশ আছে। এ হাতে ভারী কোনো কাজকর্ম করতে পারি না।
একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের আরও কিছু কথা মনে পড়ে। নভেম্বর মাসে কলমাকান্দায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। সেই জায়গার নাম মনে নেই। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধের পর ওরা পিছু হটে যায়। পরের সপ্তাহে জেলার বারহাট্টায় দুজন পাকিস্তানি সেনাকে ধরে এনে গুলি করা হয়েছিল। আমি সেই দলের একজন ছিলাম। গৌরীপুরে ওয়ারলেস অফিস দখল করতে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে আমি অংশগ্রহণ করি। তবে সব তারিখ ও সময় মনে নেই।
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন: বিজয় চন্দ্র দাস, নেত্রকোনা প্রতিনিধি