আগের দিন ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীকে চার শর্ত দিয়েছিলেন, আর বাংলার মুক্তিকামী মানুষকে দিয়েছিলেন ১০ নির্দেশনা। তার ভিত্তিতেই ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়। এই অসহযোগে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন থেকে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের সিনেমা হলগুলোতে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশন বন্ধ করে দেন হলমালিকরা। পূর্ব পাকিস্তান কার্যত চলতে থাকে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠায় যুক্তরাজ্য ও পশ্চিম জার্মানির ১৭৮ জন নাগরিক এদিন ঢাকা ছেড়ে চলে যান।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ৮ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা বেতার থেকে সম্প্রচার করা হয়। প্রদেশের অন্যান্য বেতার কেন্দ্র থেকেও তা রিলে করা হয়। এদিন শিল্পীরা বেতার-টেলিভিশনে শর্ত দেন, তারা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন, তবে সব অনুষ্ঠান আন্দোলনের অনুকূল হতে হবে। কর্তৃপক্ষ শিল্পীদের এ শর্ত মানতে বাধ্য হয়। ৮ মার্চ থেকে ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সব শহর-গ্রামে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কলকারখানা জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ করে দেয়। পুলিশ বাহিনী ও ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশমতোই কাজ শুরু করেন।
ব্রিটেনে প্রবাসী প্রায় ১০ হাজার বাঙালি দেশটির রাজধানী লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে স্বাধীন বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ইসলামাবাদে পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের ব্যাপারে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া শর্ত সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ এবং ডাকসুর ভিপি (সহসভাপতি) আ স ম আব্দুর রব ও জিএস (সাধারণ সম্পাদক) আবদুল কুদ্দুস মাখন এদিন যৌথ বিবৃতি দেন। এই বিবৃতিতে তারা রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান যে প্রত্যক্ষ কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য বাংলার সংগ্রামী জনতার প্রতি আহ্বান জানান।
রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষিত নির্দেশের ব্যাখ্যা দেন। বলা হয়, ব্যাংকগুলো সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের ভেতরে নগদ জমা, বেতন ও মজুরি প্রদান, ১ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রদান এবং আন্তব্যাংক ক্লিয়ারেন্স ও নগদ লেনদেন করতে পারবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় বিভাগগুলো খোলা থাকবে। সার সরবরাহ ও পাওয়ার পাম্পের ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। পোস্ট অফিস খোলা থাকবে। পানি ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার প্রতি ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান, ন্যাশনাল লীগের অলি আহাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পূর্ণ সমর্থন দেয়। এদিন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ নাম পরিবর্তন করে শুধু ‘ছাত্রলীগ’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
এদিনও ডায়েরি লেখেন শহিদজননী জাহানারা ইমাম। ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় তার সেই দিনের স্মৃতিচারণা। শহিদজননীর বর্ণনায়, ‘গতকাল সন্ধ্যার পর রেডিও স্টেশনের লনে কারা যেন বোমা ছুড়েছে। কাল রাতে রেডিও বন্ধ থাকার পর আজ সকাল থেকে আবার চালু হয়েছে। সকাল সাড়ে আটটায় শেখ মুজিবের বক্তৃতা প্রচারিত হলো।’
আগের দিন ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ প্রচার করেনি ঢাকা বেতার কেন্দ্র। এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। কবি সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডায়েরী’ গ্রন্থে তার উল্লেখ রয়েছে। কবি ওই দিন লেখেন, ‘আজ সাড়ে আটটায় মুজিবুর রহমানের সম্পূর্ণ ভাষণ রেডিওতে রিলে হলো। সেই তো মল খসালি, তবে কেন লোক হাসালি। এই কথাই মনে হয়। আজ ঢাকার নাগরিক জীবন স্বাভাবিক। কিন্তু কেমন একটা থমথমে ভাব ঘরে ঘরে। কারুর যেন সোয়াস্তি নেই। আল্লাহ মুজিবুর রহমানকে সুস্থ ও দীর্ঘায়ু করুন। এই প্রার্থনা।’