অগ্নিঝরা মার্চের ২১তম দিন আজ। এদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পঞ্চম দফা বৈঠক হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ধানমন্ডির বাসভবনে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম কৌঁসুলি এ কে ব্রোহির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের এ বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত কিছু জানাননি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, আগের বৈঠকের আলোচনায় উদ্ভূত কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যার জন্য এই বৈঠক।
ইয়াহিয়া খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের এ বৈঠক সম্পর্কে সিরাজুল আলম খান তার ‘আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘২১ মার্চ মুজিব ভাই বৈঠক থেকে ফিরে এসে জানালেন, নামেমাত্র এক পাকিস্তান রেখে দুই অংশের জন্য দুই প্রধানমন্ত্রী এই ঐকমত্যের ভিত্তিতে আলোচনা শেষ হয়েছে।’
ইয়াহিয়া-মুজিবের এদিনের বৈঠক সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব ২১ মার্চ ইয়াহিয়াকে জানিয়ে দেন, আপাতত প্রদেশগুলোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। শেখ মুজিবের দেওয়া প্রস্তাবগুলো ছিল: ক. অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার; খ. পাঁচটি প্রদেশে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর; গ. কেন্দ্রে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়ার বহাল থাকা; ঘ. জাতীয় পরিষদে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যদের আলাদা সভা করে নিজ নিজ প্রদেশগুলোর জন্য সংবিধান তৈরি; ঙ. ১৯৬২ সালের সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতা অথবা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিজেদের স্বায়ত্তশাসনের পরিধি ঠিক করা; এবং চ. এই প্রস্তাবগুলো প্রেসিডেন্টের একটি আদেশ হিসেবে জারি করা।’
এদিন বিকেলে ধানমন্ডির বাসভবনে সমবেত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বুলেট-বেয়োনেট দ্বারা কখনো সাড়ে সাত কোটি বাঙালির দাবিকে স্তব্ধ করা যাবে না।’ গুজব ও বিভেদ সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে সতর্ক থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আমন্ত্রণে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ২১ মার্চ বিকেলে সদলবলে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। ভুট্টোর আগমন উপলক্ষে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে সেনা মোতায়েন করা হয়। সাংবাদিকদের বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ভুট্টোকে বিমানবন্দর থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়ে আসার সময় রাস্তার দুপাশের পথচারীরা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হোসেন রাজা তার ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘২১ মার্চ, ১৯৭১ জনাব ভুট্টো তার দলীয় উপদেষ্টা আর দলবল নিয়ে ঢাকায় এসে পৌঁছালেন। তার আসার মাত্র এক দিন আগে আমরা খবর পেলাম। মার্শাল ল’ স্টাফ ব্রিগেডিয়ার (পরবর্তী সময়ে লে. জেনারেল) গোলাম জিলানী খান এবং অন্যরা ভুট্টো ও তার দলবলের নিরাপত্তা এবং থাকার ব্যবস্থা করার কথা ভাবতে লাগলেন। তারা প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করলেন। পীরজাদা জানিয়ে দিলেন, ভুট্টো এবং তার লোকজন, তাদের জন্য কোনো অফিসিয়াল প্রটোকলের দরকার নেই। ঢাকায় পৌঁছালে তাদের নিজেদেরই নিজেদের থাকা খাওয়া ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নিতে হবে।’
তিনি (খাদিম হোসেন রাজা) আরও লেখেন, ‘ভুট্টো এবং তার দল’কে এ রকম বিপদের মুখে ছেড়ে দিলে ব্যাপারটা ভয়ানক হতে পারে। ভুট্টো রেগে আবার পূর্বের যুদ্ধংদেহী মনোভাব গ্রহণ করে ফেলতে পারেন- যা কি না পশ্চিম পাকিস্তানে আগুন জ্বালিয়ে দেবে। অবশেষে আমরা তার থাকার ব্যবস্থা করলাম ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এবং সেখানে থাকাকালীন নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করলাম। ঢাকার গ্যারিসন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের ওপর দায়িত্ব পড়ল এসব করার এবং ব্যক্তিগতভাবে ভুট্টোর নিরাপত্তা দেখার।’
নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সৃষ্ট এমন এক পরিস্থিতিতে পশ্চিম পাকিস্তানি এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার (খাদিম হোসেন রাজা) মূল্যায়ন ছিল এ রকম, ‘দু’জন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রেসিডেন্ট এবং চিফ অব আর্মি স্টাফ এক ছাদের নিচে বসে একটি ফলহীন সমঝোতা আলোচনায় আটকে রইলেন। দুই নেতা যার যার ক্ষেত্রে চরম ভাবাপন্ন হয়ে রইলেন। ফলে সমঝোতার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ়করণে একটি পরিকল্পনা করেই বসে ছিলেন। তাদের কাছাকাছি অবস্থিত যে কেউ বুঝতে পারতো যে সমঝোতার আলোচনাটি অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল।’
আরেক উর্দুভাষী পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী তার ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ভুট্টোর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে বা আলোচনায় বসতে মুজিব অস্বীকার করেছিলেন। ইয়াহিয়া, মুজিব, ভুট্টো এই তিনজন যদিও একই ছাদের নিচে মিলিত হচ্ছিলেন, তথাপি মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে কথাবার্তা চলছিল ইয়াহিয়ার মাধ্যমে। এতটাই ভুট্টোর প্রতি পূর্ব পাকিস্তানীদের বৈরিতা; জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি হওয়ার এবং তার পরিণতিতে সংঘটিত দাঙ্গা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য ভুট্টোকে পূর্ব পাকিস্তানিরা এক নম্বর ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ভুট্টো সমঝোতার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন।’
চট্টগ্রামের পোলো গ্রাউন্ডে ২১ মার্চ বিকেলে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয় হয়। সেখানে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, আলোচনায় ফল হবে না। এ দেশের হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে চাপরাশি পর্যন্ত যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে মানে না, তখন শাসনক্ষমতা শেখ মুজিবের হাতে দেওয়া উচিত।
২১ মার্চ সন্ধ্যায় পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো কড়া সেনা প্রহরায় প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। সেখানে ভুট্টো ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক শেষে হোটেলে ফেরেন তিনি। হোটেল লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের ভুট্টো বলেন, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সাংবাদিকদের আর কিছু না বলে ভুট্টো সরাসরি লিফটে ওঠেন। সাংবাদিকরা তার সঙ্গে যেতে চাইলে ব্যক্তিগত প্রহরীরা তাদের বাধা দেন।
এদিকে জয়দেবপুরে জারি করা কারফিউ ২১ মার্চ দুপুর ১২টায় ৬ ঘণ্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। পরে সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পুনরায় কারফিউ বলবৎ করা হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানায় এবং কর্মসূচি ঘোষণা করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচির প্রতি তাদের সমর্থন ঘোষণা করে।
ঢাকার মগবাজারে মহিলা সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠনের আহ্বান জানানো হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি পণ্য বর্জনের সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দেয়।