অগ্নিঝরা মার্চের ২৪তম দিন আজ। পাকিস্তানি শাসকদের প্রহসনের আলোচনার একদম শেষ দিন ছিল ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ। এদিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ ও সরকারের মধ্যে উপদেষ্টা পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে তাজউদ্দীন আহমেদ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বক্তব্য প্রদান শেষ হয়েছে। এখন প্রেসিডেন্টের উচিত তার দিক থেকে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা।
তাজউদ্দীন আহমদ আরও বলেন, ‘আজ (২৪ মার্চ) প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আলোচনা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘ করতে রাজি নয়।’
এদিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বাঙালির ওপর হায়েনার শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীকে চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেন আলোচনা উপলক্ষে বাংলাদেশে আসা পাকিস্তানি রাজনীতিক, সামরিক-বেসামরিক আমলা ও পরামর্শকরা। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় নেতা-কর্মীদের পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া (প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান) ২৪ মার্চ টিক্কা খান ও ফরমান আলীকে ডেকে অপারেশন সার্চলাইট চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন।’ ইয়াহিয়ার বক্তব্য ছিল, ‘দেশকে অখণ্ড রাখার জন্য কয়েক হাজার মানুষ মারতে হলেও এটি খুব বড় একটি মূল্য নয়।’
সিরাজুল আলম খান তার ‘আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, “আমি দুপুরে গেলাম। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন, ‘ইয়াহিয়া আমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে।’ মুজিব ভাই বললেন, ‘আমাগীকাল রাতেই ওরা আক্রমণ করবে। প্রথম পর্যায়েই প্রতিরোধটা যেন শক্ত হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে।’ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘কাউকে বলিস না। আমি বাসাতেই থাকব। আমাকে না পেলে ওরা উন্মাদের মতো আচরণ করবে আর সে সুযোগে আমাকে মেরেও ফেলবে’।”
সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “২৪ মার্চ আওয়ামী লীগ একটি নতুন প্রস্তাব নিয়ে এল। আগের শাসনতান্ত্রিক কমিটির প্রস্তাব পরিত্যাগ করে শাসনতান্ত্রিক কনভেনশনের প্রস্তাব দিল। এই কনভেনশন পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য পৃথক পৃথক দুটি শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করবে। জাতীয় পরিষদ এই দুটি শাসনতন্ত্র নিয়ে বৈঠকে বসবে। একীভূত করা হবে ‘পাকিস্তান কনফেডারেশন’, করার লক্ষ্যে। একই দিনে ভুট্টো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করলেন। দুজনেই এই ঐকমত্যে পৌঁছেন যে, সম্ভবত প্রথমবারের মতো নয় যে, আওয়ামী লীগ তার বাজির চাল ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন থেকে পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ভাঙনের পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় সংহতি রক্ষা করার জন্য তারা যে ব্যবস্থাই গ্রহণের চিন্তাভাবনা করুন না কেন কিংবা যা-ই সিদ্ধান্ত নেন না কেন, ঘোষণা করা হলো যে, আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি তাজউদ্দীন আহমেদ সন্ধ্যায় ঘোষণা করলেন, ‘তার দল চূড়ান্ত’ প্রস্তাব পেশ করেছে এবং এতে নতুন কিছু সংযোজন কিংবা সমঝোতামূলক কিছু করার নেই।”
তিনি (সিদ্দিক সালিক) আরও লিখেছেন, “ভুট্টোর সহচর, পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং উপদেষ্টারা করাচির পথে ‘ফেরা’ শুরু করলেন। যেমন বুদ্ধিমান পাখিরা আসন্ন ঝড়ের আগে আপন আপন নীড়ে ফিরে যায়।”
এদিন প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন জেলা শহরে। চট্টগ্রামে পাক সেনারা নৌ-বন্দরের ১৭ নং জেটিতে নোঙর করা এম. ভি. সোয়াত জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাস করতে গেলে সেখানকার মানুষ তাদের ঘিরে ফেলে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা জাহাজ থেকে কিছু অস্ত্র নিজেরাই খালাস করে ১২টি ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা পথরোধ করে। সেনাবাহিনী ব্যারিকেড দেওয়া জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
এ প্রসঙ্গে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম তার ‘লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ব্রিগেডিয়ার আনসারীর ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে ২৪ মার্চ সোয়াত থেকে অস্ত্র খালাস শুরু হলো। ডক শ্রমিকরা আগে এ কাজ করতে অস্বীকার করেছিল বলে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের নবাগতদের এ দায়িত্ব দেওয়া হলো। এতে চট্টগ্রামের লোকেরা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। বন্দর থেকে ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় তারা ব্যারিকেড সৃষ্টি করল। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য সৈন্য নিয়োগ করা হলো। বিক্ষুব্ধ জনতার একটি দল এ সময় বন্দরের দিকে এগোতে থাকে। ইতোপূর্বে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেনাবাহিনী তা বাতিল করে দেয়। মিছিলে লোকসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। ‘যে কোনো মূল্যে অস্ত্র নামাতেই হবে’ বলে ব্রিগেডিয়ার আনসারী হুংকার ছাড়লেন। শুধু তাই নয়, অবশেষে জেটি এলাকা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রথম পরীক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হলো। সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে কতজন মারা গিয়েছিল, কতজন আহত হয়েছিল, হয়তো তার সঠিক সংখ্যা কখনো জানা যাবে না।”
অগ্নিগর্ভ মার্চের এদিন সৈয়দপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে কয়েক শ বাঙালিকে হত্যা করে। এর মধ্যে ছিল রংপুর হাসপাতালের সামনে ক্ষুব্ধ জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সেনাদের সেনানিবাস-সংলগ্ন এলাকায় নিরস্ত্র অধিবাসীদের ওপর বেপরোয়া গুলি চালায়। এতে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।
মিরপুরে অবাঙালিরা বাঙালিদের বাড়ির ওপর ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা জোর করে নামিয়ে দেয়। এ কাজে সাদাপোশাক পরা পাকিস্তানি সেনারা তাদের সহায়তা করে। রাতে অবাঙালি বিহারিরা ওই এলাকায় ব্যাপক বোমাবাজি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
এদিন, অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র গণবিপ্লবকে আরও জোরদারে জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়।